সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারি ঋণের মোট ব্যয়ে। সাম্প্রতিক নিলামে ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদ প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছানোয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ নিলামে সরকার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে, যেখানে সুদের হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। মাত্র এক মাস আগেও একই মেয়াদের বন্ডে সুদ ছিল ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ। অল্প সময়ের ব্যবধানে এমন বৃদ্ধি বাজারে তারল্য সংকট ও ঝুঁকি ধারণার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় সরকার ক্রমেই ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে অর্থের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব না আসায় ঋণ নেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকছে না।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি আরও বেড়ে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ব্যাংকগুলোও কম সুদে সরকারকে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। তাদের মতে, বাজারে অতিরিক্ত তারল্য নেই এবং সামনে সরকারের ঋণ চাহিদা আরও বাড়বে—এমন ধারণা থেকেই তারা বেশি সুদ দাবি করছে। ফলে ট্রেজারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে উচ্চ রিটার্ন নিশ্চিত করতে চাইছে ব্যাংকগুলো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে সরকার ইতোমধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়েছে। জুলাই থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক ভারসাম্যে চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেজারি বন্ডের সুদ বাড়লে এর প্রভাব পুরো ঋণ ব্যবস্থায় পড়ে। কারণ এই হারকে ভিত্তি ধরে অন্যান্য ঋণের সুদ নির্ধারণ করা হয়। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদও বাড়তে শুরু করে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশে স্থির রয়েছে, যা বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক থাকায় ব্যাংকগুলোও নিরাপদ খাতে অর্থ বিনিয়োগে ঝুঁকছে।
ব্যাংকারদের মতে, তুলনামূলক নিশ্চিত মুনাফার কারণে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ এখন বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সার্বিকভাবে, সরকারের ঋণ নির্ভরতা ও উচ্চ সুদের এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

