রাষ্ট্রমালিকানাধীন রূপালী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত অনাদায়ী দায় বা ফোর্সড লোন দ্রুত বাড়তে থাকায় ব্যাংকটির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ধরনের দায় প্রায় ১.৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে দেশে ব্যাংক খাতে ফোর্সড লোনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ওই বছরে যা ছিল প্রায় ৯৭৬ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১.২৩ বিলিয়ন ডলারে। পরবর্তী দুই বছরে আরও বৃদ্ধি পেয়ে এটি প্রায় ১.৪৯ বিলিয়ন এবং সর্বশেষ পর্যায়ে ১.৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বাড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ফোর্সড লোন সাধারণত তৈরি হয় যখন আমদানিকারকরা নির্ধারিত সময়ে এলসির বিপরীতে বৈদেশিক দেনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। সে ক্ষেত্রে ব্যাংক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাওনা নিজ তহবিল থেকে পরিশোধ করে এবং পরে ওই অর্থ গ্রাহকের নামে ঋণ হিসেবে যুক্ত করে। ফলে ব্যাংকের ওপর নগদ চাপ বাড়ে এবং সম্পদের গুণগত মান দুর্বল হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের ঋণ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া মানে হলো ব্যবসায়িক চেইনে নগদ প্রবাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে আমদানি নির্ভর খাতে দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে। এতে শুধু ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট নয়, পুরো আর্থিক খাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
ঢাকা ব্যাংকিং গবেষণা সংস্থার একজন শীর্ষ বিশেষজ্ঞের মতে, ফোর্সড লোনের এই পরিমাণ ব্যাংকের জন্য সতর্ক সংকেত। তার মতে, ব্যাংক যদি দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ সামলাতে না পারে, তবে তা অনাদায়ী ঋণে রূপ নিয়ে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
রূপালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানায়, ফোর্সড লোনের বড় অংশই তৈরি হয়েছে তৈরি পোশাক খাতের এলসি লেনদেন থেকে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকে অর্থ পরিশোধ করা হলেও দেশীয় গ্রাহকরা তা পরিশোধ করতে পারেননি। এতে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে আরও দেখা গেছে, ব্যাংকটি আমদানি-সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ বিল অব এন্ট্রি নথি জমা দিতে পারেনি। প্রায় ২.২০ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে পণ্য দেশে প্রবেশের যথাযথ প্রমাণ অনুপস্থিত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং অর্থপাচারের ঝুঁকির ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন অথরাইজড ডিলার শাখা খোলার একটি আবেদন বাতিল করে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক লেনদেনে অনিয়মের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। একই সময়ে ব্যাংকটির বৈদেশিক বাণিজ্যের সূচকগুলোও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আমদানি, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স—সব ক্ষেত্রেই পতন দেখা গেছে। এতে ব্যাংকের আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে যেখানে ব্যাংকটির আমদানি ছিল ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৩৬ মিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই ধারাবাহিক পতন ব্যাংকের ব্যবসায়িক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের হারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মোট ঋণের প্রায় ৪২ শতাংশ এখন অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে, যা ব্যাংকটির আর্থিক কাঠামোকে দুর্বল করে তুলছে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও একাধিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। কিছু শাখায় আগের অনাদায়ী ঋণ গোপন রেখে নতুন ঋণ অনুমোদন, অভ্যন্তরীণ অনুমোদন ছাড়াই ফোর্সড লোন সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয়ের অপব্যবহারের মতো ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যারও প্রতিফলন। তারা বলছেন, বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার কঠোর নজরদারি ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, বিল অব এন্ট্রির ঘাটতি, ফোর্সড লোন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে পতন—সব মিলিয়ে ব্যাংকটি একটি উচ্চ ঝুঁকির পর্যায়ে প্রবেশ করছে। দ্রুত কার্যকর সংস্কার না হলে এটি আরও বড় আর্থিক চাপে পরিণত হতে পারে।

