সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ধার নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য জোগানের পদক্ষেপও এই প্রবণতাকে আরও জোরদার করেছে।
মানি মার্কেট বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলো সাধারণত তারল্য ঘাটতি মেটাতে আন্তঃব্যাংক বাজার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়। তবে বর্তমানে ঋণের চাহিদা কম থাকায় সেই প্রয়োজনও কমে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ধার নেওয়ার আগ্রহও কমে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কলমানি বাজারে লেনদেনের পরিমাণ মার্চে নেমে এসেছে প্রায় ৯৪৫ বিলিয়ন টাকায়, যা গত বছরের সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরের তুলনায় অনেক কম। এটি ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ কার্যক্রম কমে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো সুবিধার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ধার নেওয়াও কমেছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে এই ঋণের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি, তা ধাপে ধাপে কমে ২০২৬ সালের মার্চে আরও নিচে নেমে এসেছে।
বিশেষ তারল্য সহায়তা ব্যবস্থার আওতায়ও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন সুবিধার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মোট ধার নেওয়া গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা সামগ্রিকভাবে তারল্য চাহিদা কমার প্রতিফলন।
একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তার মতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে বাজার থেকে ডলার কিনছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ টাকা যোগ হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলার কেনার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে উল্লেখযোগ্য তারল্য প্রবাহিত হয়েছে।
এই অতিরিক্ত তারল্যের কারণে অনেক ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট সুবিধায় অর্থ জমা রাখছে, যদিও সেখানে সুদের হার তুলনামূলক কম। তবুও ঝুঁকি কম হওয়ায় ব্যাংকগুলো এই পথেই এগোচ্ছে। তথ্য বলছে, মার্চ মাসে এই ডিপোজিট সুবিধায় ব্যাংকগুলোর জমা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা তাদের অতিরিক্ত তারল্যের ইঙ্গিত দেয়।
ব্যাংকারদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে এটি প্রায় ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প খাত নানা সমস্যার মুখে পড়ায় নতুন বিনিয়োগও কমে গেছে।
বিশেষ করে জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও সম্প্রসারণে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। এতে করে তারা নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনও কম অনুভব করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যাংকিং খাতের আয় ও প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়তে পারে। তাই অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফেরানো এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

