বাংলাদেশে নগদবিহীন লেনদেনের প্রসারে দ্রুত শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক–এর মোবাইল অ্যাপ ‘নেক্সাস পে’। চুপচাপ বিস্তার ঘটিয়ে অ্যাপটি ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি ব্যবহারকারীর ফোনে জায়গা করে নিয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই অ্যাপের মাধ্যমে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসেই লেনদেনের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি থাকছে, যা ব্যবহারকারীদের ক্রমবর্ধমান আস্থা ও নির্ভরতার প্রতিফলন।
২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা ‘নেক্সাস পে’ প্রথমদিকে সীমিত সেবা নিয়ে চালু হলেও সময়ের সঙ্গে এতে যুক্ত হয়েছে নানা সুবিধা। এখন শুধু ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের গ্রাহকই নয়, অন্যান্য ব্যাংকের ভিসা ও মাস্টারকার্ড ব্যবহারকারীরাও এই অ্যাপের সেবা নিতে পারছেন। ফলে এটি ধীরে ধীরে একটি সর্বজনীন ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির ধারাও উল্লেখযোগ্য। ২০২৩ সালে যেখানে মোট ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ৬২ লাখ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৯০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই আরও চার লাখের বেশি নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হয়ে মার্চ শেষে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ লাখ ৫০ হাজারে।
লেনদেনের পরিমাণে যে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা আরও বিস্ময়কর। ২০২৩ সালে মোট লেনদেন ছিল প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে তা দ্বিগুণের বেশি হয়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকায়। ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। অর্থাৎ দুই বছরে লেনদেন প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেনদেনের ধরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অর্থ স্থানান্তর হয়েছে একই ব্যাংকের এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে। এ ছাড়া অন্যান্য ব্যাংকে অর্থ পাঠানো, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কিউআর কোডের মাধ্যমে কেনাকাটা এবং মোবাইল রিচার্জ—সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার দোকানে কিউআর কোডের মাধ্যমে এই অ্যাপ ব্যবহার করে পেমেন্ট করা যাচ্ছে।
লেনদেনের সংখ্যার দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় ৪ কোটি লেনদেন হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৮ কোটিতে পৌঁছায়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই সম্পন্ন হয়েছে ২ কোটির বেশি লেনদেন।
ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রবণতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একটি অ্যাপের মাধ্যমে একাধিক ব্যাংকের গ্রাহকদের সংযুক্ত করা গেলে নগদ অর্থের ব্যবহার কমে আসে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হয়।
তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহক তথ্য সুরক্ষা এবং সেবার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় আস্থার এই প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। সব মিলিয়ে ‘নেক্সাস পে’ এখন শুধু একটি মোবাইল অ্যাপ নয়, বরং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে পরিণত হচ্ছে—যা ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সেবার ধরনই বদলে দিতে পারে।

