এক সময় দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও স্থিতিশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শীর্ষে থাকা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ-এর আর্থিক অবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের অবনতি দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের পর থেকে বিশেষ করে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটির মুনাফা, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পতনের চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন বিশ্লেষণে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে মাত্র ১০৮ কোটি টাকায় নেমে আসে, যেখানে আগের বছর তা ছিল ৬৩৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেও এই পতন অব্যাহত থাকে, যা ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকটি ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ছিল। আমানত, বিনিয়োগ আয়, কমিশন আয় এবং গ্রাহকসংখ্যা—সব সূচকেই ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যায়। তবে পরবর্তী সময়ে সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হয়নি। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও আমানত বেড়েছে, কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ হওয়ায় প্রত্যাশিত ফল আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রেমিট্যান্স আহরণেও বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংগ্রহ করলেও বর্তমানে তা ২০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। একইভাবে আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমেও দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে আমদানি ও রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি ছিল, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট।
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, প্রকৃত আর্থিক চিত্রে বড় অঙ্কের লোকসান রয়েছে, যা প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। অনুমান করা হচ্ছে, এই গোপন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার মতো হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো খেলাপি বিনিয়োগের হার। আগে যেখানে এটি ৪ শতাংশের নিচে ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতিও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, যা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর সংস্কার, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা হলে ব্যাংকটির সংকট আরও গভীর হতে পারে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো ব্যাংকিং খাত ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

