দেশের ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নিরাপদ ও নিশ্চিত মুনাফার আশায় ব্যাংকগুলো ক্রমেই সরকারের কাছে ঋণ দেওয়ার দিকে ঝুঁকছে, যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ধীর হয়ে পড়ছে। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬.৫ শতাংশ, তা চলতি বছরের শুরুতে আরও নেমে এসেছে ৬ শতাংশের কাছাকাছি। যদিও মোট ঋণের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে, তবে প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগতি অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৮ শতাংশ, যা বাস্তবতায় অর্জিত হয়নি।
অন্যদিকে সরকারের ঋণ গ্রহণ দ্রুত বাড়ছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ইতোমধ্যে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে এবং অর্থবছরের শেষ দিকে এই প্রবণতা আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আচরণ এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে উচ্চ সুদহার ব্যাংকগুলোকে আকৃষ্ট করছে। বর্তমানে এসব সরকারি সিকিউরিটিজে সুদের হার ১১ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে থাকায় ঝুঁকিহীনভাবে ভালো মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলো আমানতের বড় অংশ এসব খাতে বিনিয়োগ করছে। এতে ব্যাংকের আয় বাড়লেও সরকারের সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
এদিকে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ নেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নতুন বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাবেও ঋণের খরচ বেড়েছে, ফলে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
ব্যবসায়ী মহলের মতে, এত উচ্চ সুদের পরিবেশে শিল্প উদ্যোগ লাভজনক রাখা কঠিন। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের বদলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে আস্থার ঘাটতিও ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে।
খেলাপি ঋণের উচ্চ হার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। মোট ঋণের বড় অংশ অনাদায়ী হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তারাও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারল্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রেজারি খাতে বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি। এজন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, আস্থার সংকট দূর করা এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে, সরকারি ঋণে ব্যাংকের অতিরিক্ত নির্ভরতা স্বল্পমেয়াদে লাভজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন বিশ্লেষকদের মূল উদ্বেগ।

