দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে গত দুই দশকে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তবে এই পরিবর্তনের বড় অংশই উদ্বেগ বাড়ানোর মতো বলে মনে করছে সরকার। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমন এক অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরেছেন, যেখানে ঋণের ভার, খেলাপি ঋণের বিস্তার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
অর্থমন্ত্রীর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের তুলনায় দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণ এখন প্রায় ১৬ গুণ বেড়েছে। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ পৌঁছেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৬ সালে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে সেই অঙ্ক বেড়ে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র দুই দশকে ঋণের বোঝা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে বৈদেশিক ঋণও দ্রুত বেড়েছে। ২০০৬ সালে যেখানে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, বর্তমানে তা ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে।
ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সুদ পরিশোধের দায়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দুই দশক আগে যেখানে সুদ পরিশোধে ব্যয় হতো সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার মতো, এখন সেই ব্যয় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের এই বাড়তি চাপ ভবিষ্যতে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হারও অতীতের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতার অবস্থাও দুর্বল হয়েছে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে না। একসময় যেখানে দেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৩ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমের মন্থরতার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। কয়েক বছর আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতি এখন অনেক বেশি, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।
বাজেট বক্তব্যে আয় বৈষম্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সমাজে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য আগের তুলনায় বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছাতে না পারায় এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়াকেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈদেশিক বাণিজ্যেও চাপের চিত্র উঠে এসেছে বাজেট বক্তব্যে। রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নেও বাংলাদেশের ঝুঁকির অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। আগে নিম্ন ঝুঁকির দেশ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে বাংলাদেশকে মধ্যম ঝুঁকির দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে।
এদিকে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও মোট ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হবে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা আগামী বছরগুলোতে সরকারের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

