বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিশ্চয়তা চাচ্ছে দেশের ব্যাংকগুলো। ঋণ আবার খেলাপি হলে ক্ষতি থেকে বাঁচতেই এমন দাবি তাদের। এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের আগে আয়োজিত এক বৈঠকে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
কর্মসংস্থান বাড়ানো ও শিল্পখাত সচল করতে বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি বিশেষ তহবিল গঠন এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। সেই লক্ষ্যে ব্যাংকারদের সঙ্গে মতবিনিময়ে উঠে আসে নানা শর্ত ও উদ্বেগের বিষয়। খুব শিগগিরই এ–সংক্রান্ত নীতিমালা ও তহবিল ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে, এবং ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাবও চাওয়া হয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, বন্ধ কারখানায় নতুন করে ঋণ দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের আগের ঋণ ইতিমধ্যেই খেলাপি এবং তা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। তাই নতুন অর্থায়নে গেলে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঝুঁকি কমাতে তারা ঋণের বিপরীতে সরকারি গ্যারান্টি বা ক্ষতিপূরণ নিশ্চয়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি জামানত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে সরাসরি তদারকি বা পরামর্শক নিয়োগের সুযোগ রাখার সুপারিশও এসেছে। ব্যাংকাররা মনে করছেন, শুধু অর্থ দেওয়া নয়, কার্যকর নজরদারি ছাড়া এই উদ্যোগ সফল হবে না।
নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব উদ্যোক্তা ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়েছেন, তাদের এই সুবিধার আওতায় আনা হবে না। বরং যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি—যেমন বাজার ধস, জ্বালানি সংকট বা বৈশ্বিক প্রভাব—কারণে বন্ধ হয়েছে, তারাই অগ্রাধিকার পাবে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন সময় ধরে বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর জন্য আলাদা ধরনের অর্থায়ন রাখা হবে। সম্প্রতি বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমেয়াদি সহায়তা পেতে পারে। দুই থেকে পাঁচ বছর ধরে বন্ধ থাকা এবং যেগুলোর বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তাদের জন্য মধ্যমেয়াদি ঋণের চিন্তা করা হচ্ছে। আর দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থেকে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়া কারখানার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংকারদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অতীতে দেওয়া প্রণোদনা ঋণের একটি বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মহামারির সময় ঘোষিত বড় আকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ফল আশানুরূপ হয়নি। এই বাস্তবতা নতুন করে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে তুলেছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান কিছুটা কঠোর। তারা স্পষ্ট করেছে, নীতি সহায়তা দেওয়া হলেও ঝুঁকির দায় পুরোপুরি রাষ্ট্র নেবে না; ব্যাংকগুলোকেই তাদের ঋণ সিদ্ধান্তের দায়িত্ব বহন করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বন্ধ কারখানা চালু হলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে সঠিক যাচাই-বাছাই, কঠোর নজরদারি এবং স্বচ্ছ নীতিমালা ছাড়া এই উদ্যোগ উল্টো ব্যাংক খাতে চাপ বাড়াতে পারে। তাই ঝুঁকি ও সম্ভাবনার ভারসাম্য রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

