গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট’ (ওভিওপি) নামে নতুন উদ্যোগ হাতে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় পণ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগে ৬৪ জেলার প্রত্যন্ত এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং দেশের ৫২টি ব্যাংক এতে যুক্ত থাকবে। লক্ষ্য হচ্ছে, উৎপাদক ও উদ্যোক্তাদের একটি বৃহৎ নেটওয়ার্ক তৈরি করে এক কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
প্রকল্পের প্রাথমিক রূপরেখা পর্যালোচনায় সম্প্রতি একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ব্যাংক খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এবং একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উৎপাদিত অনেক পণ্যের বাজার সম্ভাবনা থাকলেও অর্থায়ন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের অভাবে তা বিস্তার পাচ্ছে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতেই ওভিওপি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি জেলায় নির্দিষ্ট একটি বা একাধিক পণ্যকে কেন্দ্র করে উৎপাদকদের সংগঠিত করে ‘ক্লাস্টার’ গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ক্লাস্টারে অন্তত ৫০ জন উৎপাদক থাকবে এবং তারা একই এলাকায় সমন্বিতভাবে কাজ করবে। এতে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্যালু চেইন তৈরি হবে।
উদ্যোগটি সাতটি প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে—পণ্য নির্বাচন, ক্লাস্টার উন্নয়ন, অর্থায়ন, বাজার ও রপ্তানি সংযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্প্রসারণ। এসবের মাধ্যমে গ্রামীণ উৎপাদকদের একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রকল্পে প্রচলিত জামানতনির্ভর ঋণের পরিবর্তে ভ্যালু চেইনভিত্তিক অর্থায়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও রপ্তানির প্রতিটি ধাপে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হবে। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজে অর্থায়ন পেতে পারবেন।
ডিজিটাল ব্যবস্থাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উৎপাদককে ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনা, বিকল্প তথ্য ব্যবহার করে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ এবং কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্যের উৎস ও মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হবে। এতে স্বচ্ছতা ও আস্থাও বাড়বে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিন ধাপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ক্লাস্টার নির্বাচন ও নিবন্ধন, দ্বিতীয় ধাপে বাজার সম্প্রসারণ এবং তৃতীয় ধাপে দেশের অধিকাংশ গ্রামে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও কর্মসংস্থান সেই অনুপাতে বাড়েনি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক নতুন শ্রমশক্তি যোগ হলেও অধিকাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় গ্রামীণ উৎপাদনভিত্তিক এই উদ্যোগ সফল হলে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং ধারাবাহিক তদারকির ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারলে এটি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

