দেশের ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশ এখন সীমিত কয়েকটি ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছে। মোট খেলাপির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ১০টি ব্যাংকের কারণে তৈরি হয়েছে বলে সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা গেছে। এতে পুরো ব্যাংক খাতেই ছোট ঋণ বিতরণ ও আদায়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, এই খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকেই রয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপির প্রায় ৬৮ শতাংশ। অথচ এসব ব্যাংকের হাতে সিএমএসএমই ঋণের অংশ তুলনামূলকভাবে কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। এই খাতে মোট ব্যাংক ঋণের অংশ কমে এসেছে এবং ধারাবাহিকভাবে তা হ্রাস পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ব্যাংক ঋণের মধ্যে সিএমএসএমই খাতের অংশ বর্তমানে ২০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যেখানে সরকারের লক্ষ্য ছিল তা ধীরে ধীরে ২৫ শতাংশ বা তার বেশি করা। কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য এই খাতে জোর দেওয়া হলেও ব্যাংকগুলোর আগ্রহ এখনো বড় করপোরেট ঋণের দিকেই বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, কম ঝুঁকির পরিবর্তে দ্রুত মুনাফার প্রত্যাশায় অনেক ব্যাংক বড় ঋণগ্রহীতাদের দিকে ঝুঁকেছে। তবে সেই বড় ঋণের একটি অংশ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় এখন ব্যাংকগুলো চাপের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে ছোট ঋণ বিতরণে উৎসাহ বাড়াতে নীতিগত কিছু শিথিলতা আনা হলেও তা প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। জামানত ছাড়াই নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা এবং প্রভিশন শর্ত শিথিল করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যাংকগুলোর আচরণে বড় পরিবর্তন আসেনি।
পরিসংখ্যান বলছে, পুরো ব্যাংক খাতেই খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার বড় অংশই বড় করপোরেট ঋণ থেকে এসেছে। তবে ছোট ঋণের ক্ষেত্রে কিছু ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও সামগ্রিক চিত্র ইতিবাচক নয়।
বিশেষ করে কয়েকটি বড় ব্যাংকে ছোট ঋণের খেলাপির হার অত্যন্ত বেশি, যেখানে একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপির হার মোট সিএমএসএমই ঋণের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আবার কিছু ব্যাংকে এই হার তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও সামগ্রিক ঝুঁকি রয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ছোট ঋণ খাতকে শক্তিশালী না করতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে। কারণ এই খাতই মূলত গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান উৎস। তাদের মতে, শুধু ঋণ বিতরণ বাড়ানো নয়, বরং সঠিক তদারকি, দক্ষ মূল্যায়ন এবং উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে ছোট ঋণের খেলাপি সমস্যা আরও গভীর হতে পারে এবং পুরো ব্যাংক খাতের ওপর এর চাপ বাড়বে।

