দেশের প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটি সিকদার গ্রুপ—যাদের দ্রুত উত্থান যেমন আলোচনায় ছিল, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পতনও হয়ে উঠেছে বহুল আলোচিত। ব্যাংক ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, বিদেশে সম্পদ বিস্তার এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই গ্রুপটি এখন তদন্ত, মামলা ও আর্থিক সংকটে কার্যত স্থবির অবস্থায়।
ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ২০২০ সালের ৭ মে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার চেষ্টা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে গ্রুপটির শীর্ষ পর্যায়ের দুই সদস্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জোরপূর্বক আটকে রেখে নির্যাতন করেন এবং সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করেন। এই নজিরবিহীন ঘটনা ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা ও সুশাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। পরে অভিযুক্তরা বিশেষ ব্যবস্থায় দেশত্যাগ করেন, যা নিয়েও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ওঠে।
সিকদার গ্রুপের সূচনা হয়েছিল গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে আবাসন খাতের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে তারা বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং, বিমা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে প্রবেশ করে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগে গ্রুপটির ব্যবসা দ্রুত বিস্তৃত হয়। একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাদের আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
তবে এই বিস্তারের পেছনে ঋণের অপব্যবহার, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগও সমানতালে বাড়তে থাকে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পর তার বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়। তদন্ত সংস্থাগুলোর দাবি, আমানতকারীদের অর্থ ব্যবহার করে বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
২০২১ সালে প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর গ্রুপটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ শুরু হয়, যা ব্যবসার স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে পরিবারের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের মৃত্যু এবং দেশত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। নতুন প্রশাসন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের তদন্ত শুরু করলে সিকদার গ্রুপও তার আওতায় আসে। তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ করা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের শতাধিক ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়। বর্তমানে এসব বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান।
দেশ-বিদেশে বিস্তৃত ব্যবসা থাকা সত্ত্বেও এখন গ্রুপটির অধিকাংশ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে তাদের হোটেল, রেস্তোরাঁ, আবাসন ও জ্বালানি ব্যবসার উপস্থিতি থাকলেও সেগুলোর অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ঋণখেলাপির তালিকায়ও গ্রুপটির একাধিক প্রতিষ্ঠান শীর্ষে উঠে এসেছে। বিদ্যুৎ খাতের দুটি কোম্পানির বিপরীতে বিপুল অঙ্কের বকেয়া ঋণ রয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থান করে ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ ব্যয়ের ঘটনাও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং করপোরেট সুশাসনের অভাব—এই তিনটির সমন্বয়ে সিকদার গ্রুপের দ্রুত উত্থান সম্ভব হয়েছিল। তবে একই কারণে তাদের পতনও ত্বরান্বিত হয়েছে। বর্তমানে এই গ্রুপটি দেশের আর্থিক খাতে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে—যেখানে অনিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে গড়া সাম্রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

