বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও খেলাপি ঋণের পাহাড় যখন আর লুকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না, ঠিক তখনই নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে আসে একটি বড় সিদ্ধান্ত—সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা এবং গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সহজভাবে বললে, একটি শক্তিশালী কাঠামোর অধীনে এনে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করাই ছিল এই পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দু।
উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ধাক্কা থেকে রক্ষা করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই একীভূতকরণ কি সত্যিই সমস্যার স্থায়ী সমাধান, নাকি এটি কেবল গভীর সংকটকে সাময়িকভাবে আড়াল করার একটি কৌশল? বিপুল পরিমাণ সরকারি সহায়তা, আমানতকারীদের সীমিত প্রবেশাধিকার এবং শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত ফলাফল এখন নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে “পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার সুফল কী”—এই প্রশ্নটি কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চাপ, তীব্র মূলধন ঘাটতি এবং গভীর আস্থার সংকটে থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নতুন ব্যাংকটির প্রস্তাবিত নাম “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি” (Combined Islami Bank PLC) অথবা “ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক”।
এই একীভূতকরণের পেছনে মূল কারণ হলো ব্যাংকগুলোর চরম আর্থিক দুর্বলতা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের সম্মিলিত ঋণের একটি বড় অংশ—প্রায় ৮৪ শতাংশের বেশি—বর্তমানে খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে এই ব্যাংকগুলোর মোট মূলধন ঘাটতি প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি, যা দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের আর্থিক ভারসাম্যের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই আর্থিক দুরবস্থার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে সামনে এসেছে আস্থার অভাব। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং তারল্য সংকটের কারণে আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যার ফলে ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক লেনদেনেও চাপ পড়ে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর মালিকানা কাঠামো নিয়েও নানা সময়ে বিতর্ক দেখা গেছে। চারটি ব্যাংক—ইউনিয়ন, গ্লোবাল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংক নাসা গ্রুপ সংশ্লিষ্টতার কারণে আলোচনায় আসে। এসব অনিয়ম ও নিয়ন্ত্রণজনিত জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণের চাপ এবং আস্থাহীনতার পরিস্থিতিতে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত কাঠামো গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বর্তমানে দেশের আর্থিক খাতে একটি বড় সংস্কার পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বারবার তারল্য সহায়তা প্রদান সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কাঠামোগত পুনর্গঠনের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একত্র করে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও টেকসই একটি আর্থিক সত্তা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হলো আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার। আস্থাহীনতার ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ, তারল্য সহায়তা প্রদান এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে আমানত উত্তোলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের ফলে হঠাৎ করে অর্থ উত্তোলনের চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং ধীরে ধীরে লেনদেন স্বাভাবিক করার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এই একীভূতকরণের অন্যতম বড় সুফল হলো আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো আমানতকারী তার আমানত হারাবেন না এবং ধাপে ধাপে তাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর বিপুল আর্থিক দায়—যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অন্তর্ভুক্ত—এখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে আসছে, যা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করছে, যদিও এতে সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
নতুন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হলো ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। পূর্বের অনিয়ম, দুর্বল নজরদারি এবং একক গোষ্ঠীর প্রভাব কমিয়ে একটি পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক দিক দেখা যাচ্ছে। একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১৬ হাজার কর্মীর চাকরি অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, যা কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কমাতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি একটি বড় একক ব্যাংক গঠনের ফলে তারল্য ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
এছাড়া, নতুন ব্যাংকটি শরিয়াহভিত্তিক কাঠামো বজায় রেখে পরিচালিত হওয়ায় আগের ইসলামী ব্যাংকিং নীতির ধারাবাহিকতাও অক্ষুণ্ণ থাকছে, যা গ্রাহকদের আস্থা ও পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ধীরে ধীরে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, এই একীভূতকরণ কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি একটি চলমান আর্থিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের অনিয়মজনিত বিপুল খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল সম্পদমান এখনো নতুন কাঠামোর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার একটি সময়সাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই একীভূতকরণকে তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা অধিক বাস্তবসম্মত। স্বল্পমেয়াদে এটি সংকট নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং কার্যকর নীতিগত সংস্কারের ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ ও তীব্র তারল্য সংকটে জর্জরিত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল ব্যাংক—সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—একীভূত করার সিদ্ধান্তটি দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৫–২৬ সালের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই উদ্যোগ নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে, নতুন কাঠামোটি শুরু থেকেই বড় ধরনের আর্থিক দায় ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়—ইউনিয়ন ব্যাংকে প্রায় ৯৮ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকে প্রায় ৪৮ শতাংশ। এই ভয়াবহ খেলাপি ঋণের চিত্রই মূলত ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতার কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং একীভূতকরণের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে।
এই পাঁচটি ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি বা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। ফলে একীভূত হয়ে গঠিত নতুন কাঠামোটি প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের ভার নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে, যা শুধু নতুন ব্যাংকের জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি” নামে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক পুনর্গঠনের ব্যয় মূলত রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা পরোক্ষভাবে করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, এই ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য আমানতকারীদের কোনো মুনাফা না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে আংশিকভাবে শিথিল করা হয়। এই সিদ্ধান্ত আমানতকারীদের আস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, একীভূত হওয়ার পরও ব্যাংকিং কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন, সম্পদ পুনর্গঠন এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার জটিলতার কারণে নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম এখনো ধীরগতিতে চলছে। একই সঙ্গে আস্থা সংকট পুরোপুরি কাটেনি, যা আমানত প্রবাহ ও দৈনন্দিন লেনদেনেও প্রভাব ফেলছে। এছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের সাংগঠনিক সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাকে একত্র করা এখনো একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। একই অঞ্চলে একাধিক শাখা থাকার কারণে অনেক শাখা পুনর্গঠন বা বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে, যা কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব ফেলছে এবং অনেক কর্মীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL) একীভূত কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পুনরায় আবেদন করেছে। এটি বর্তমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সমন্বয়গত চ্যালেঞ্জের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ঘিরে। এই একীভূতকরণ তখনই কার্যকর ও সফল হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন নতুন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত হবে। অন্যথায়, এটি “দুর্বল ব্যাংক + দুর্বল ব্যাংক = আরও দুর্বল ব্যাংক” ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
সংক্ষেপে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করলেও বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে—বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝা, মূলধন জোগাতে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরতা, আমানতকারীদের মুনাফা থেকে সাময়িক বঞ্চনা এবং চলমান কাঠামোগত জটিলতা—সব মিলিয়ে এটি এখন এক গভীর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
চ্যালেঞ্জ ও অন্যান্য প্রভাব:
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই একীভূতকরণ উদ্যোগের চ্যালেঞ্জগুলো আরও স্পষ্ট ও জটিল হয়ে উঠেছে। নতুন কাঠামো দাঁড়ালেও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। একাধিক ব্যাংকের একীভূত জনবল, ভিন্ন বেতন কাঠামো এবং দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের কারণে কর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও পুনঃনিয়োগ, বদলি কিংবা নীরব ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা কাজ করছে, যা সামগ্রিক কর্মপরিবেশে প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে বড় চাপটি রয়ে গেছে খেলাপি ঋণ ঘিরে। এই ব্যাংকগুলোর বিপুল অঙ্কের ঋণ এখনো পুনরুদ্ধারের বাইরে, যার বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে নতুন ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করলেও তার আর্থিক ভিত্তি অনেকটাই দুর্বল থেকে যাচ্ছে। কাগজে সম্পদের পরিমাণ বড় হলেও বাস্তবে নগদ প্রবাহ ও মুনাফা তৈরির সক্ষমতা সীমিত—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।
এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের কাজও এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। ভিন্ন ভিন্ন কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, শাখা ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিমালাকে এক ছাঁচে আনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা সময়, দক্ষতা ও ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই রূপান্তরের সময়ে সেবার মান বজায় রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান বাস্তবতায় এই একীভূতকরণকে একটি চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বলাই বেশি যৌক্তিক। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আলাদাভাবে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে এনে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এটি তাৎক্ষণিক সমাধান নয়; বরং সময়সাপেক্ষ একটি পথ, যার সফলতা নির্ভর করছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর নীতিগত সংস্কারের বাস্তব প্রয়োগের ওপর।
পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি বড় কাঠামোগত সংস্কার। এর মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা, আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর।

