পুলিশের মালিকানাধীন কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে পদত্যাগ করলেন ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত এমডি কিমিয়া সাদাত। আগামী ১৪ মে তাঁর আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ এমডির দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনও সম্পন্ন হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে পদত্যাগের ঘটনায় দেশের ব্যাংক খাতে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বুধবার তিনি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের উচ্চপর্যায়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বলা হয়েছিল। এরপরই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কমিউনিটি ব্যাংকের নতুন এমডি পদে সরকারের প্রভাবশালী একটি মহলের পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর চেষ্টা চলছে। ওই ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনে কর্মরত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলে জানা গেছে। সেই নিয়োগের পথ তৈরি করতেই কিমিয়া সাদাতকে দায়িত্ব ছাড়তে চাপ দেওয়া হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
পদত্যাগপত্রে কিমিয়া সাদাত উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী তিন মাসের নোটিশ সময় শেষ হওয়ার পর পদত্যাগ কার্যকর হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কিমিয়া সাদাত বলেন, পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছিলেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে সরে যেতে হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে তাঁর খারাপ লাগছে।
কমিউনিটি ব্যাংকের দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়েই আলোচনায় আসেন কিমিয়া সাদাত। ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেতৃত্বে আসার পর ব্যাংকটির আর্থিক সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়। ব্যাংকের নিট মুনাফা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪৯ শতাংশ বেড়ে ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। আগের বছর যা ছিল ৭০ কোটি টাকা।
শুধু মুনাফাই নয়, আমানত ও ঋণ বিতরণেও প্রবৃদ্ধি আসে। ব্যাংকের আমানত প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ৮ হাজার কোটির বেশি হয়। একই সময়ে ঋণের পরিমাণও কয়েক শ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতেও সাফল্য দেখায় ব্যাংকটি। ২০২৪ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩ দশমিক ০৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৫ সালের শেষে তা কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৮৯ শতাংশে।
ব্যাংকটির পরিচালনায় এই ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে কমিউনিটি ব্যাংক আলোচনায় উঠে আসে। গত বছরের জন্য শেয়ারধারীদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশও ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানটি, যা একই শ্রেণির ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
এমন সময়ে সফল এক পেশাদার ব্যাংকারের আকস্মিক পদত্যাগ ব্যাংক খাতে নানা প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক প্রভাব, প্রশাসনিক চাপ এবং পেশাদারিত্বের সংকট নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, কোনো পেশাদার ব্যাংকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা ঠিক নয়। কিমিয়া সাদাতের ঘটনাটি নিয়ে পুরো তথ্য তাঁর জানা না থাকলেও, যদি চাপ বা অনিয়মের মাধ্যমে এ পদত্যাগ ঘটে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা ব্যাংকিং খাতে পেশাদার ব্যবস্থাপনার পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভীতির সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগে পক্ষপাত এবং পরিচালনা কাঠামো নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কমিউনিটি ব্যাংকের এই ঘটনাকে অনেকে আরও বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে পেশাদার নেতৃত্ব ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার বিকল্প নেই।

