বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের প্রধান ভরসা ছিল ব্যাংক আমানত, ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট (এফডিআর) এবং সঞ্চয়পত্র।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্রে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। নিরাপদ ও তুলনামূলক স্থিতিশীল রিটার্নের খোঁজে এখন অনেকেই ঝুঁকছেন সরকারি সিকিউরিটিজ—ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড এবং ইসলামি বিনিয়োগপণ্য সুকুকের দিকে।
বিশেষ করে যাদের হাতে অলস অর্থ রয়েছে, কিন্তু শেয়ারবাজারের ঝুঁকি নিতে চান না কিংবা সঞ্চয়পত্রের সীমাবদ্ধতায় আটকে আছেন—তাদের কাছে নতুন বিনিয়োগের দরজা খুলে দিচ্ছে এই সরকারি বন্ড ও বিল বাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও বাজারনির্ভর করতে এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এই খাতে যুক্ত করার উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে। এজন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে এবং সুকুক বিনিয়োগেও নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কী এই ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড:
সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণ এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে ঋণপত্র ইস্যু করে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্রকে বলা হয় ট্রেজারি বিল (টি-বিল) এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্রকে বলা হয় ট্রেজারি বন্ড (বিজিটিবি)।
ট্রেজারি বিল সাধারণত ৯১ দিন, ১৮২ দিন এবং ৩৬৪ দিনের মেয়াদে ইস্যু করা হয়। এগুলো ডিসকাউন্ট মূল্যে কেনা হয় এবং মেয়াদ শেষে পূর্ণ মূল্য ফেরত দেওয়া হয়। ফলে ক্রয়মূল্য ও ফেরত মূল্যের ব্যবধানই বিনিয়োগকারীর লাভ।
অন্যদিকে ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ সাধারণত ২ বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব বন্ডে নির্দিষ্ট হারে কুপন সুদ প্রদান করা হয় এবং সাধারণত প্রতি ছয় মাস অন্তর সেই সুদ পরিশোধ করা হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি গ্যারান্টি থাকায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডকে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগপণ্যের একটি হিসেবে ধরা হয়, যেখানে মূলধন হারানোর ঝুঁকি প্রায় নেই।
এক সময় ধারণা ছিল ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেবল ব্যাংক বা বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য। তবে বাস্তবে এখন যে কেউ—দেশি নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি কিংবা ছোট উদ্যোক্তাও এতে বিনিয়োগ করতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যূনতম ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেই সরকারি বিল বা বন্ড কেনা সম্ভব। এজন্য একটি বিজনেস পার্টনার আইডেন্টিফিকেশন (বিপি আইডি) খুলতে হয়, যা সাধারণত ব্যাংকের মাধ্যমে করা যায়।
প্রয়োজনীয় নথির মধ্যে রয়েছে— জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), টিআইএন সনদ, ছবি, ব্যাংক হিসাবের তথ্য এবং নমিনির তথ্য।
এরপর বিনিয়োগকারী সরাসরি নিলামে অংশ নিতে পারেন অথবা সেকেন্ডারি মার্কেট থেকেও এসব সিকিউরিটিজ কিনতে পারেন।
কীভাবে চলে পুরো বাজার
নতুন ট্রেজারি বিল বা বন্ড ইস্যুর সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেয় প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ব্যাংকগুলো।
এই ব্যাংকগুলো সরকার থেকে সিকিউরিটিজ কিনে পরে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে। পাশাপাশি সেকেন্ডারি মার্কেটেও কেনাবেচা চলে।
বর্তমানে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক সক্রিয়ভাবে এই বাজারে কাজ করছে।
সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংককে নতুন প্রাইমারি ডিলার হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে দেশে পিডি ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬টিতে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান জানিয়েছেন, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে তারা সরকারি বন্ড বাজারে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সুদের হার এখন কত:
বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সুদের হার ব্যাংক আমানত ও এফডিআরের তুলনায় বেশ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৯ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী—
৯১ দিনের বিল: ১০.১৭ শতাংশ
১৮২ দিনের বিল: ১০.৪৯ শতাংশ
৩৬৪ দিনের বিল: ১০.৬৪ শতাংশ
দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে হার আরও বেশি—
২–৩ বছর: ১০.২% থেকে ১০.৬%
৫ বছর: ১০.৭৫%
১০ বছর: ১০.৯৮%
১৫ বছর: ১১.১৫%
২০ বছর: ১১.২৩%
ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে এই হার অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো, চাইলে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেও বিক্রি করা যায়। সেকেন্ডারি মার্কেটে এটি নগদায়নের সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য পিডি ব্যাংকের মাধ্যমে বাজারদর অনুযায়ী লেনদেন সম্পন্ন হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদি নগদ ব্যবস্থাপনায় ট্রেজারি বিল কার্যকর, আর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল আয়ের জন্য ট্রেজারি বন্ড বেশি উপযোগী।
ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগপণ্য সুকুকেও এখন আগ্রহ বাড়ছে। সরকারি এই বিনিয়োগ মাধ্যমকে অনেকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সুকুক বিনিয়োগ সহজ করতে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে। এখন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজেই সুকুক ইনভেস্টর আইডি খোলা যাবে।
ফি কাঠামো অনুযায়ী—
ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ২০০ টাকা
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা
সেকেন্ডারি লেনদেনে প্রতি ট্রানজেকশনে ১০০ টাকা
তবে মুনাফা, আসল ফেরত বা হিসাব বন্ধের ক্ষেত্রে কোনো ফি লাগবে না।
কী লাগে সুকুক বিনিয়োগে:
সুকুক ইনভেস্টর আইডি খুলতে প্রয়োজন— আবেদন ফরম, ব্যাংক হিসাব, এনআইডি বা পাসপোর্ট, ছবি, টিআইএন (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) এবং নমিনির তথ্য। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে নিবন্ধন সনদ, বোর্ড রেজোল্যুশন এবং অন্যান্য আইনি নথি প্রয়োজন হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে আস্থার ঘাটতি এবং অনিশ্চিত বিনিয়োগ পরিবেশ মানুষকে নিরাপদ আয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সঞ্চয়পত্রের সীমাবদ্ধতা এবং কর কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে বিকল্প খোঁজার প্রবণতা বাড়ছে। অন্যদিকে ব্যাংক আমানতের সুদও অনেক সময় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
এই বাস্তবতায় সরকারি ট্রেজারি বিল, বন্ড এবং সুকুক ধীরে ধীরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অনলাইন সুবিধা বৃদ্ধি ও সচেতনতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে দেশের বন্ডবাজার আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হতে পারে

