পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক একীভূত করে গঠিত হতে যাওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অতীতে বিতর্কিত সময়ে দায়িত্বে থাকা এবং পরে পদত্যাগ করা কয়েকজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তাকে সাক্ষাৎকারে ডাকার ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ভেতরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এমডি পদে নিয়োগের লক্ষ্যে প্রথম ধাপের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ছয়জন ব্যাংকার। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি জাফর আলমও। তিনি এমন সময়ে ব্যাংকটির নেতৃত্বে ছিলেন, যখন চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাংক খাতে ব্যাপক সমালোচনা চলছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পর তিনি চাপের মুখে পদত্যাগ করেন বলে ব্যাংকসংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা ছিল।
শুধু জাফর আলম নন, সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি নুরুদ্দিন মো. ছাদেকের সাক্ষাৎকার নেওয়াও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। কারণ, তাঁর দায়িত্বকালে ব্যাংকটিতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছিল। পরে তিনিও স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি পদে মোট ১২ জন আবেদন করেছেন। দুই দিনে তাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। বুধবার যাঁরা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আরও ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির, সীমান্ত ব্যাংকের সাবেক এমডি রফিকুল ইসলাম, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের বাংলাদেশ শাখার প্রধান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এবং ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট জাকির হোসেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের পরিকল্পনা দেশের ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন উদ্যোগগুলোর একটি। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে নতুন এই ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংক দীর্ঘদিন এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর এক্সিম ব্যাংক ছিল ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের প্রভাবাধীন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, যেহেতু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কার্যত সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে, তাই এমডি নিয়োগের পুরো বিষয়টি দেখভাল করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তবে অতীতে বিতর্কিত ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারে ডাকা পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এমডি নিয়োগের জন্য গঠিত কমিটিতে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক আশরাফুল আলম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, অতিরিক্ত সচিব আজিমুদ্দিন বিশ্বাস এবং খাতসংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন প্রতিনিধি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাক্ষাৎকার শুরুর ঠিক আগে কয়েকজন প্রার্থীর বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন হাতে আসে। সেখানে দুজন প্রার্থীর অতীত ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নতুন তথ্য উঠে আসে। তবে শেষ মুহূর্তে তথ্য পাওয়ায় তাঁদের সাক্ষাৎকার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। যদিও চূড়ান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে এমডি হিসেবে চূড়ান্ত করা হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত যোগ দেননি। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি সরে দাঁড়ান। একই সময়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াও পদত্যাগ করেন। ফলে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার পুরো প্রক্রিয়া শুরুতেই ধাক্কার মুখে পড়ে।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা ফেরাতে হলে নতুন ব্যাংক কাঠামোয় দক্ষ, নিরপেক্ষ ও বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক অতীতে নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগে আলোচিত ছিল, সেগুলোর পুনর্গঠনে নেতৃত্ব নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাঁদের মতে, যদি পুরোনো বিতর্কিত ব্যক্তিরাই আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন, তাহলে একীভূতকরণের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েও জনমনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

