দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও স্বস্তির সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজনৈতিক পরিবর্তন, ব্যবসায়িক অস্থিরতা ও মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়েছে, তাদের খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার জন্য নতুন নীতিসহায়তা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান মোট বকেয়া ঋণের মাত্র ২ শতাংশ জমা দিয়েই খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পাবে। এ সুবিধার আওতায় পুনঃতফসিল করা ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারবে। পাশাপাশি ঋণ নিয়মিত হওয়ার পর প্রথম দুই বছর কিস্তি পরিশোধে বিরতিও দেওয়া হবে।
তবে আগে যেসব গ্রাহক একই ধরনের নীতিসহায়তা নিয়ে ঋণ নিয়মিত করেছেন, তারা এবার নতুন এই সুবিধা পাবেন না। শুধু ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণগুলোই এই সুবিধার আওতায় আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার তিন মাসের মধ্যেই তা নিষ্পত্তি করতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। একই সঙ্গে এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগও রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে গ্রাহকরা এক বছরের সময় পাবেন এবং এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আলাদা অনাপত্তিপত্র লাগবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ডাউন পেমেন্ট চেক বা অন্য কোনো মাধ্যমে জমা দেওয়া হলে সেটি নগদায়নের পর থেকেই আবেদন নিষ্পত্তির সময় গণনা শুরু হবে। অর্থ জমা না হওয়া পর্যন্ত নীতিসহায়তার আবেদন কার্যকর হবে না।
এ ছাড়া এককালীন ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঋণগুলো নিয়ম অনুযায়ী হিসাবভুক্ত রাখতে হবে। ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতিও সংরক্ষণ করতে হবে। পুরো ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহককে নতুন ঋণ সুবিধা দেওয়া যাবে না।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার শিল্পকারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিশেষ তহবিল গঠনেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেওয়া বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা ব্যবহার করে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ নিয়মিত করেছে। এতে গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে খেলাপি ঋণ প্রায় ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে যায়।
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে এই অঙ্ক ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে আসে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে ক্ষমতা ছাড়ার আগে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ে। অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরে বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ শিল্পগোষ্ঠী তাদের ঋণ নিয়মিত করে নেয়। যদিও এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও ওঠে।
ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও হল-মার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ কেলেঙ্কারি ব্যাংক খাতে বড় চাপ তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের নানা অনিয়মও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি আর্থিক অনিয়মের শিকার হয়েছে। পাশাপাশি প্রচলিত ধারার কয়েকটি ব্যাংকেও বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

