দেশের ব্যাংকিং খাত এখন বড় ধরনের আস্থাসংকট, তারল্যচাপ ও সুশাসনের অভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, নতুন শাখা ও আমানত প্রবৃদ্ধির চিত্র দেখা গেলেও ভেতরে জমেছে খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক অনিয়মের দীর্ঘ ছায়া। অর্থনীতিবিদদের মতে, এখনই কঠোর সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল সমস্যা অর্থের ঘাটতি নয়, বরং আস্থার সংকট। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ী ও গোষ্ঠী বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করেও নানা সুবিধা পেয়েছেন। পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় কিংবা আইনি জটিলতার আড়ালে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি ব্যাংক খাতকে দুর্বল করেছে। অন্যদিকে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকে আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কোথাও চেক ফেরত গেছে, কোথাও নির্দিষ্ট সীমার বেশি টাকা তুলতে পারেননি গ্রাহকরা। এতে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়লে শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যাংক খাতের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সামগ্রিক অর্থনীতিও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, গত দেড় দশকে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিছু গোষ্ঠী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান শুরু হবে। বিশেষ করে ব্যাংক দখল, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের একটি ধারা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন যুক্ত হওয়া ১৮(ক) ধারা একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের পুরোনো মালিকপক্ষকে আবারও নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেও উদ্বেগ রয়েছে বলে জানা গেছে। কারণ যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের পুনরায় সুযোগ দেওয়া হলে সংস্কার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ব্যাংক খাতের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি ব্যাংক নয়; বরং কোটি গ্রাহকের আস্থা, প্রবাসী আয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। বিপুল আমানত, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগের কারণে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সম্প্রতি জানিয়েছেন, কিছু মহল বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করছে। তবে ব্যাংকটির আমানতভিত্তি ও গ্রাহক নেটওয়ার্ক এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রতি আস্থা দুর্বল হলে এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতে পড়তে পারে।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতিও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু ব্যাংক একীভূত করলেই সংকটের সমাধান হবে না। রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি বন্ধ না হলে নতুন কাঠামোও ব্যর্থ হতে পারে। তাদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের অনুসন্ধান, সম্পদ জব্দ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরীক্ষা নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক-ও ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। তাদের মতে, অনিয়মে জড়িত পুরোনো মালিকদের ফের সুযোগ দেওয়া হলে তা সংস্কারবিরোধী বার্তা দেবে। বর্তমানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে থাকায় এসব সংস্থার আস্থা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও উচ্চ সুদের চাপও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক ব্যাংক উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করায় ঋণের খরচ বেড়ে গেছে। এতে শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ কমছে এবং ব্যবসায়ীরা চাপের মুখে পড়ছেন।
রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে বড় বিষয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, যাদের কারণে সংকট তৈরি হয়েছে, তাদের ফের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মন্তব্য করেন, ব্যাংক খাতের অনিয়ম নিয়ে থ্রিলার সিনেমাও তৈরি করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। সুশাসন, জবাবদিহি ও কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার পথে এগোতে না পারলে সংকট আরও বাড়বে। তবে সময়মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরতে পারে, কমতে পারে দুর্নীতি এবং সুরক্ষিত হতে পারে সাধারণ মানুষের আমানত।

