উচ্চ সুদের চাপে থাকা ব্যক্তিগত, আবাসন ও গাড়ি ঋণগ্রহীতাদের লক্ষ্য করে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংক এশিয়া। অন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া এসব ঋণ কম সুদে নিজেদের অধীনে নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে ব্যাংকটি। নতুন এই সুবিধায় গ্রাহকেরা সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ সুদে ঋণ স্থানান্তরের সুযোগ পাবেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছেন—এমন অনেক গ্রাহকের মাসিক কিস্তির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংক খাতজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যক্তিগত ও আবাসন ঋণের সুদহার নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে গত তিন বছরে নেওয়া অনেক ঋণের সুদ দুই অঙ্কে পৌঁছে যায়। এই বাস্তবতায় বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্ত করতে এবং অপেক্ষাকৃত নিরাপদ খাতে ঋণ বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে ব্যাংক এশিয়া। ব্যাংকটির মতে, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও গাড়ির বিপরীতে দেওয়া ঋণে খেলাপির ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। কারণ এসব ঋণের বিপরীতে সম্পদ জামানত হিসেবে থাকে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া ব্যক্তিগত ঋণ, হোম লোন ও গাড়ি ঋণ নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যাংক এশিয়ায় স্থানান্তর করা যাবে। এ সুবিধা নিতে গ্রাহকদের আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে আবেদন করতে হবে। দেশের যেকোনো শাখার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে বলেও জানিয়েছে ব্যাংকটি।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমানে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের বড় অংশই কিস্তির চাপে রয়েছে। নতুন করে কম সুদে ঋণ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হলে অনেক পরিবার আর্থিক স্বস্তি পেতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মধ্যেও খুচরা ঋণ নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন জানিয়েছেন, বেশি সুদে ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের চাপ কমাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের জন্যও স্বল্প সুদের আবাসন ঋণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ সহজ করতে সরকার–সমর্থিত ঋণসেবা পৌঁছে দিতে চায় ব্যাংকটি।
দেশের এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে অন্যতম বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ব্যাংক এশিয়া। বর্তমানে তাদের এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহক প্রায় ৭২ লাখ। এই বিশাল গ্রাহকভিত্তিকে ব্যবহার করে খুচরা ঋণ বাজারে আরও বিস্তৃত হওয়ার পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকটি যদি স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণ কার্যকরভাবে দিতে পারে, তাহলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ব্যাংক এশিয়ার আমানত ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৩৩ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকায়। শুধু ২০২৪ সালের তুলনায় এক বছরেই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আমানত বেড়েছে।
ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি গত বছর খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর দেয় ব্যাংকটি। এর প্রভাব পরিচালন মুনাফাতেও দেখা গেছে। ২০২৩ সালে পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০৫ কোটি টাকায়। ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে ১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়। যদিও একই সময়ে নিট মুনাফা হয়েছে ৪৪৪ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৩ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশে পৌঁছায়। এমনকি গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে খেলাপি ঋণ ১৯ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। তবে বছর শেষে তা কমে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয় ব্যাংকটি।
ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে বড় করপোরেট ঋণের তুলনায় খুচরা ও ভোক্তা ঋণে ঝুঁকি তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক ব্যাংকই এখন এ খাতে আগ্রহী হচ্ছে। বিশেষ করে জামানতভিত্তিক আবাসন ও গাড়ি ঋণকে স্থিতিশীল আয়ের উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাংক এশিয়ার নতুন উদ্যোগকে সেই পরিবর্তিত বাজার কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

