দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা কমলেও এর পেছনে প্রকৃত আর্থিক উন্নতির চেয়ে হিসাবগত সমন্বয়ের প্রভাব বেশি বলে মনে করছে অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি। সংস্থাটির মতে, ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং রাইট-অফের মতো বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণের আনুষ্ঠানিক হার কমে এসেছে। তবে এতে ব্যাংক খাতের প্রকৃত ঝুঁকি বা আর্থিক দুর্বলতা দূর হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে মূল সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে গেছে।
রাজধানীতে আয়োজিত এক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে সিপিডি বলেছে, কয়েকটি সূচকে সাময়িক স্বস্তির আভাস মিললেও অর্থনীতির ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতা এখনও বহাল রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়।
সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে আসে। তবে এই হ্রাসকে প্রকৃত অর্থে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং হিসাব থেকে বাদ দেওয়ার কারণে পরিসংখ্যানে উন্নতির চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সিপিডির মতে, ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর একটি হলো ঋণ-ক্ষতি সংরক্ষণ বা প্রভিশনিং। এই ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও তা বাস্তব ঝুঁকি কমে যাওয়ার প্রমাণ নয়। বরং বিভিন্ন আর্থিক কৌশল প্রয়োগের ফলে সূচকগুলো তুলনামূলক ভালো দেখাচ্ছে। ফলে ব্যাংক খাতে প্রকৃত ঝুঁকি কতটা গভীর, তা নির্ধারণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকিং খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তারল্য পরিস্থিতি। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্যাংকগুলোর হাতে অলস অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে অতিরিক্ত তারল্যের হার ছিল ৪৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে ঋণ ও আমানতের অনুপাত কমে গেছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি এমন একটি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয় যেখানে ব্যাংকগুলোর কাছে অর্থ রয়েছে, কিন্তু তারা ঋণ দিতে আগ্রহী নয় অথবা ব্যবসায়ীরা নতুন ঋণ নিতে অনাগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতারও প্রতিফলন। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার এবং ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণচাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হওয়ার বদলে স্থবির হয়ে থাকছে।
সিপিডি আরও জানিয়েছে, বর্তমানে ১৭টি ব্যাংকের সম্পদমান পর্যালোচনার কাজ চলছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। এই তথ্য ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি প্রকৃত তথ্য ও প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারী, আমানতকারী এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক খাতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিয়ন্ত্রক শিথিলতার সুযোগ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ সীমিত করার পাশাপাশি এসব ঋণকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে রাজস্ব খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের গতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে শেষ প্রান্তিকে অস্বাভাবিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আদায়ে কিছু উন্নতি হলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। এতে সরকারের ব্যয় নির্বাহ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর নির্ধারিত শর্ত পূরণে চাপ বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছে সিপিডি। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং সেবাখাতের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমছে না।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। অর্থাৎ আয় বাড়লেও বাজারে সেই আয়ের কার্যকর মূল্য কমে যাচ্ছে।
সিপিডির মূল্যায়নে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে সাময়িক উন্নতির আভাস থাকলেও ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা এবং মূল্যস্ফীতির মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি। ফলে অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা ঝুঁকি মোকাবিলায় কাঠামোগত সংস্কার ও কঠোর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

