দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থায়নের গতি আরও বেড়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে দেশের ব্যাংকগুলো। শুধু লক্ষ্যমাত্রা পূরণই নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যও অতিক্রম করেছে ব্যাংকিং খাত। বিশেষ করে বিশেষায়িত ব্যাংক ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে কৃষিঋণ বিতরণে এ সাফল্য এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ কৃষি ও পল্লী ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৫৮টি অংশগ্রহণকারী ব্যাংক মোট ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে। আগের অর্থবছরে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই অর্থবছরের জন্য ব্যাংকগুলোর সামনে ৩৯ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। বাস্তবে ব্যাংকগুলো সেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে ১০৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ অর্জন করেছে, যা কৃষি অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট কৃষিঋণ বিতরণে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। মোট বিতরণকৃত ঋণের ৪৩ দশমিক ১৫ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর অবদান ছিল ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো করেছে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো। তারা ১২ হাজার ৬১৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যের ১২৩ দশমিক ৪ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অর্জন করেছে ১০৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ১০৮ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ১০৪ দশমিক ০৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে।
তবে সব ধরনের ব্যাংকের মধ্যে একমাত্র ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। তারা ৬ হাজার ৫৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের ৯৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে কৃষিঋণের খাতভিত্তিক বণ্টনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রও উঠে এসেছে। নীতিগতভাবে মোট কৃষিঋণের ৫৫ শতাংশ ফসল উৎপাদনে দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে এ খাতে বিতরণ হয়েছে ৪৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতটি নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী অর্থায়ন পায়নি।
অন্যদিকে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছে মোট ঋণের ২৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা নির্ধারিত ২০ শতাংশ লক্ষ্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একইভাবে মৎস্য খাত এবং কৃষিবহির্ভূত গ্রামীণ কর্মকাণ্ডেও নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
তবে সেচ ব্যবস্থা ও কৃষিযন্ত্র ক্রয়ের মতো উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ঋণ বিতরণ এখনো অনেক কম। এ খাতে মোট কৃষিঋণের মাত্র ০ দশমিক ৯৩ শতাংশ বিতরণ হয়েছে, যেখানে নীতিগত লক্ষ্য ছিল ২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষির আধুনিকায়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সেচ এবং যান্ত্রিকীকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ঋণ বিতরণের পাশাপাশি আদায়েও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষিঋণ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৬২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেশি। ইসলামী ধারার ব্যাংক ছাড়া প্রায় সব ধরনের ব্যাংকেই ঋণ আদায়ের হার বেড়েছে।
কৃষিঋণের গুণগত মানেও কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে। জুন মাসের শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ১৯ হাজার ৮০৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। একই সময়ে শ্রেণিকৃত কৃষিঋণও ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকায়।
বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তারা আগের অর্থবছরের তুলনায় ঋণ আদায় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়েছে। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো তাদের কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ বা শ্রেণিকৃত কৃষিঋণ নেই, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি দেশের খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। তবে ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়নের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং কৃষিযন্ত্র ও সেচ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করছে, চলতি অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণে অর্জিত সাফল্য ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। তবে একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে যে, এখনো বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ও শ্রেণিকৃত কৃষিঋণ ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তাই নতুন ঋণ বিতরণের পাশাপাশি পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের কার্যকর ব্যবস্থাপনায় আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই কৃষি অর্থায়নের এই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে এবং দেশের কৃষি খাত আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

