দেশে চলমান নগদ অর্থের সংকট মোকাবিলায় পুরোনো নকশার মুদ্রা বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মানুষের হাতে নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং নতুন নোট সরবরাহে ঘাটতির কারণে সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় পুরোনো নকশার কিছু প্রস্তুত নোট বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এসব নোটের একটি অংশে আগের ডিজাইনের প্রতিকৃতি রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত ছিল সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে।
প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার পুরোনো নোট বাজারে ছাড়া হতে পারে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে বর্তমানে তৈরি হওয়া নগদ টাকার ঘাটতি কিছুটা প্রশমিত করার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে নতুন নকশার মুদ্রা ছাপার কাজও জোরদার করার উদ্যোগ চলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঈদ-পরবর্তী সময়ে নগদ টাকার চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা, ভোক্তা ব্যয় এবং ব্যাংক থেকে নগদ উত্তোলন বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বড় অঙ্কের টাকা চলে যায়। এর ফলে এটিএম বুথসহ বিভিন্ন ব্যাংক শাখায় নগদ সংকট দেখা দেয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি মূলত মুদ্রা প্রবাহের সাময়িক ভারসাম্যহীনতা। কারণ অর্থনীতিতে মোট অর্থের পরিমাণ কমেনি, বরং তা সাধারণ মানুষের হাতে নগদ আকারে বেশি ধরে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে তারল্য কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ছাপানো মুদ্রার একটি বড় অংশ সবসময়ই মানুষের হাতে এবং কিছু অংশ ব্যাংকের ভল্টে সংরক্ষিত থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখা নিয়মিতভাবে নগদ অর্থের আদান-প্রদান করে। পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত নোট আলাদা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফেরত পাঠানো হয় এবং সেগুলোর পরিবর্তে নতুন নোট সরবরাহ করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নকশার নোট পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে না আসায় এই স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নকশার মুদ্রা প্রণয়ন, অনুমোদন ও ছাপার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে বাজারে থাকা পুরোনো নোটের ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ঈদ-পরবর্তী সময়ে নগদ টাকার চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেতন-ভাতা বিতরণের কারণে ব্যাংকিং সিস্টেমে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এটি অস্থায়ী পরিস্থিতি এবং খুব শিগগিরই তা স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যাংকারদের মতে, এটিএম বুথে নগদ সংকটের বিষয়টি মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার চাপের ফল। কারণ ব্যাংক শাখাগুলো নির্দিষ্ট সীমার বেশি নগদ অর্থ ভল্টে রাখতে পারে না এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করে থাকে। একইভাবে জমা প্রক্রিয়াও নিয়মিতভাবে চলে। এই চক্রে বিঘ্ন ঘটলে স্বল্পমেয়াদি নগদ সংকট তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, ছাপানো মুদ্রার মোট পরিমাণ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সঞ্চিত থাকলেও তা সক্রিয়ভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে না ফেরায় তারল্য সংকট দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে শুধু নতুন নোট ছাপাই নয়, বরং ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং নগদ ব্যবহারের প্রবণতা কমানো জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত নগদ সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজারে তারল্য স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যারও একটি ইঙ্গিত, যা সমাধানে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।

