বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে নতুন এক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বহু বছর ধরে বিদেশের নিরাপদ ভল্টে সংরক্ষিত থাকা স্বর্ণ এখন ধীরে ধীরে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনছে বিভিন্ন রাষ্ট্র। একই সঙ্গে অনেক দেশ স্বর্ণ সংরক্ষণের জন্য বিকল্প কেন্দ্রও খুঁজছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় পরিবর্তিত বাস্তবতা এ প্রবণতার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, আগের তুলনায় কমসংখ্যক কেন্দ্রীয় ব্যাংক লন্ডন ও নিউইয়র্কে তাদের স্বর্ণ মজুদ রাখছে। বরং নিজ দেশের ভল্টে স্বর্ণ স্থানান্তর কিংবা নতুন সংরক্ষণ কেন্দ্র বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক স্বর্ণ সংরক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পশ্চিমা আর্থিক হাবগুলোর আধিপত্য ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে। অনেক দেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল নিয়েছে। এর ফলে স্বর্ণ আবারও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে সামনে এসেছে। বর্তমানে অনেক দেশের কাছে স্বর্ণ শুধু একটি বিনিয়োগ সম্পদ নয়, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে লন্ডন ও নিউইয়র্ক স্বর্ণ সংরক্ষণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। লন্ডনের ভল্টগুলোতে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্বর্ণ সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাণিজ্য ও ফিউচার লেনদেনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, বৈশ্বিক বাণিজ্য সংঘাত, আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক দেশের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে বিদেশে রাখা সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। ফলে স্বর্ণকে দেশের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে আনা এখন অনেকের কাছে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জরিপে অংশ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জানিয়েছে, তারা দেশে স্বর্ণ সংরক্ষণের পরিমাণ বাড়িয়েছে অথবা বিদেশে সংরক্ষণের স্থান পরিবর্তন করেছে। মাত্র এক বছর আগেও এ হার ছিল অনেক কম। এটি ইঙ্গিত করছে যে বৈশ্বিক স্বর্ণ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি ফ্রান্স। দেশটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে সংরক্ষিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ ফিরিয়ে নিয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে রাখা কিছু স্বর্ণ বিক্রি করে ইউরোপে নতুন করে স্বর্ণ সংগ্রহের মাধ্যমে আর্থিক লাভও করেছে। এর ফলে শুধু ভাণ্ডারের অবস্থানই বদলায়নি, বরং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায়ও নতুন সুবিধা পেয়েছে দেশটি।
একই পথে হাঁটছে ভারতও। কয়েক বছর আগেও ভারতের স্বর্ণের বড় অংশ বিদেশে সংরক্ষিত ছিল। তবে ধাপে ধাপে সেই নির্ভরতা কমানো হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট স্বর্ণ মজুদের বিদেশে রাখা অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এতে বোঝা যায়, বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যেও নিজ দেশে স্বর্ণ সংরক্ষণের আগ্রহ বাড়ছে।
এদিকে এ পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে দেখছে এশিয়ার কয়েকটি আর্থিক কেন্দ্র। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও হংকং আন্তর্জাতিক স্বর্ণ সংরক্ষণ সেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য আধুনিক ভল্ট ও নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলছে, যাতে ভবিষ্যতে স্বর্ণ সংরক্ষণের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবর্তনের এই ঢেউ সত্ত্বেও লন্ডনের গুরুত্ব এখনই কমে যাচ্ছে না। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে তরল স্বর্ণবাজার এখনো সেখানে অবস্থিত। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কেনাবেচা হওয়ায় লন্ডন আন্তর্জাতিক বাজারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই রয়ে গেছে।
তবুও পরিসংখ্যান বলছে, লন্ডন ও নিউইয়র্কে স্বর্ণ রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। অনেক দেশ এখন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে তাদের স্বর্ণ একাধিক স্থানে ভাগ করে রাখছে। এতে কোনো একটি অঞ্চল বা দেশের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রবণতা কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন নয়; এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। একটি দেশ কোথায় তার স্বর্ণ সংরক্ষণ করবে, সেটি অনেক সময় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কৌশলগত অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে সেই দেশের দৃষ্টিভঙ্গিরও ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক স্বর্ণ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন শুধু কত স্বর্ণ কিনবে তা নয়, বরং কোথায় রাখবে—সেই প্রশ্নকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। আর এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

