দেশের ব্যাংক খাতে আলোচিত অনিয়মের তালিকায় নতুন করে যোগ হয়েছে এনআরবিসি ব্যাংকের নাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে পরিচালিত একটি ফরেনসিক অডিটে উঠে এসেছে, ব্যাংকটির তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় ব্যাপক কারসাজি, ঋণ অনিয়ম, স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুবিধা প্রদান, শেয়ারবাজারে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতার অভিযোগ।
অডিট প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত তথ্য হলো, ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে প্রায় ১১ লাখ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার ঘটনা। তদন্তকারীদের ধারণা, ঋণ অনিয়ম, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র এবং আর্থিক অসঙ্গতি আড়াল করতেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কয়েকজন ব্যবহারকারী ব্যাংকের তথ্যভান্ডার থেকে ঋণ, গ্রাহক এবং ট্রেড ফাইন্যান্সসংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ তথ্য অপসারণ করেছেন। এসব তথ্য মুছে ফেলার পেছনে অনুমোদিত কোনো নথি বা প্রশাসনিক অনুমতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টিকে ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফরেনসিক অডিটে আরও দেখা গেছে, ১২ হাজারের বেশি হিসাব খোলা হয়েছে বাধ্যতামূলক ‘গ্রাহককে জানুন’ বা কেওয়াইসি নথি ছাড়াই। অর্থপাচার ও সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিরোধে কেওয়াইসি একটি মৌলিক শর্ত হলেও এ ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে খেলাপি ঋণের হার ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ দেখালেও অডিটে প্রকৃত হার প্রায় ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ঘোষিত তথ্যের তুলনায় প্রকৃত খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তদন্তে উঠে এসেছে, কিছু প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সক্ষমতা যাচাই ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। কোথাও পুনঃতফসিলের শর্ত পূরণ না করেও সুবিধা দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও খেলাপি হওয়ার পরও ঋণকে নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রভিশন বা ঋণঝুঁকির বিপরীতে সংরক্ষিত অর্থের ঘাটতি। তদন্তকারীরা বলছেন, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ হাজার ৬০০ কোটির বেশি টাকায় পৌঁছেছে। হাজার হাজার ঋণ হিসাবের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে জামানতের মূল্য অতিরঞ্জিত দেখিয়ে প্রকৃত ঝুঁকি কম দেখানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছেও বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণের তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঋণ অনুমোদনের সময় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা একে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখছেন।
শেয়ারবাজারে ব্যাংকের কিছু বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে দেখা গেছে, আলোচিত কারসাজি চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে চিহ্নিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের বিনিয়োগ ছিল। এসব বিনিয়োগ থেকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যাংক। ফলে অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন হয় এবং ব্যাংকের আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
ক্রয় ও ঠিকাদারি কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই কাজ দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো ঠিকাদার নিজে কাজ না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করেছে। তদন্তকারীরা এসব ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমেও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। অডিটে পরীক্ষা করা অধিকাংশ কার্ড ফাইলে প্রয়োজনীয় নথি অনুপস্থিত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে কেওয়াইসি তথ্যও পাওয়া যায়নি। একই কর্মকর্তার মাধ্যমে অস্বাভাবিক সংখ্যক ক্রেডিট কার্ড অনুমোদনের ঘটনাও তদন্তকারীদের নজরে এসেছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর পরিচালিত পর্যালোচনায় সাইবার নিরাপত্তা, ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনা, ব্যবহারকারী নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য সংরক্ষণে একাধিক উচ্চ ঝুঁকির বিষয় শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দুর্বলতা শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ফরেনসিক অডিটে চিহ্নিত অভিযোগগুলোর প্রকৃতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন বিভাগের মাধ্যমে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা শুধু একটি ব্যাংকের অনিয়মের চিত্র নয়; বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, জবাবদিহির সংকট এবং তদারকির ঘাটতির প্রতিফলন। তাদের মতে, প্রকৃত সংস্কার নিশ্চিত করতে হলে শুধু অনিয়ম চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষাও সমানভাবে জরুরি।
ফরেনসিক অডিটে উঠে আসা তথ্যগুলো এখন ব্যাংকিং খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বড় অনিয়মের ঘটনায় পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্নটিও আবার সামনে চলে এসেছে।

