দেশের ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধির চিত্রে নতুন একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বজায় রাখা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় এখন দ্রুত হারে আমানত বাড়ছে সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে। ব্যাংক খাতে সামগ্রিক আমানতের পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির এই পার্থক্যকে আর্থিক খাতের আস্থা সংকটের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। এক বছর আগে একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার আমানত। প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ।
তবে এ প্রবৃদ্ধির পেছনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমানতের মোট পরিমাণে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখনো শীর্ষে থাকলেও প্রবৃদ্ধির হারে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংক এগিয়ে গেছে।
গত এক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৫১ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি, প্রায় ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হলো আস্থার পুনর্বিন্যাস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে তারল্য সংকট, অনিয়মিত আমানত পরিশোধ, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কারণে অনেক গ্রাহকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে আমানতকারীদের একটি অংশ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক গ্রাহক তাদের সঞ্চয় সরিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করা সরকারি ব্যাংকে স্থানান্তর করছেন। বাজারে এমন ধারণা রয়েছে যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পেছনে সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকায় আমানতের নিরাপত্তা তুলনামূলক বেশি।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংকটও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে এসব ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে দেশের বড় ও সুসংগঠিত কিছু বেসরকারি ব্যাংকে আমানত বাড়তে থাকলেও দুর্বল ব্যাংকগুলোর নেতিবাচক প্রভাব পুরো খাতের গড় প্রবৃদ্ধিকে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে সামগ্রিক হিসাবে সরকারি ব্যাংকগুলো এগিয়ে গেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। মোট আমানতের প্রায় ৬৯ শতাংশ রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হাতে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের অংশ প্রায় ২৪ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের অংশ প্রায় ৩ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে মোট আমানতের কিছুটা বেশি ৪ শতাংশ।
এদিকে আমানত বৃদ্ধির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো গ্রামাঞ্চলের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। এক বছরে গ্রামীণ এলাকায় আমানত বেড়েছে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলের ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। যদিও মোট আমানতের প্রায় ৮৪ শতাংশ এখনো শহরাঞ্চলভিত্তিক, তবুও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সঞ্চয় প্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি আয়, প্রবাসী আয় এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার গ্রামে আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও শাখা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ফলে গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবায় অংশগ্রহণও বেড়েছে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, আমানতকারীদের কাছে শুধু উচ্চ মুনাফা বা আধুনিক সেবাই নয়, অর্থের নিরাপত্তাও এখন বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। যে ব্যাংকগুলো আস্থা ধরে রাখতে পারবে, আগামী দিনে আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন জোরদার করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যথায় আমানতকারীদের আস্থার এই পরিবর্তন আরও গভীর হতে পারে এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতিযোগিতার মানচিত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

