তারল্য সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে আরও ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ এই অর্থসহ মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে মোট ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন, দৈনন্দিন লেনদেন এবং অন্যান্য সেবা নির্বিঘ্ন রাখতে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ঋণ অনিয়ম, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতার কারণে ব্যাংকটি তীব্র তারল্য চাপে রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একাধিক ধাপে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক হওয়ায় ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকটিতে কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত রয়েছে। তাই কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।
এদিকে ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। বৈঠক শেষে সংগঠনটি সাত দফা দাবি উত্থাপন করে। তাদের অন্যতম দাবি হলো, বিতর্কিতভাবে অর্জিত বলে অভিযোগ থাকা শেয়ারগুলোর মালিকানা বিষয়ে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া। এসব শেয়ার আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া অথবা শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বিক্রির প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।
ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার সহজ হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির দাবিও জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পুনর্বহালের বিষয়টি নতুন পরিচালনা পর্ষদের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে দাবি করেছে গ্রাহক প্রতিনিধিরা।
২০১৭ সালে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তনের পর থেকেই ইসলামী ব্যাংক নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণের বিস্তার, করপোরেট সুশাসনের প্রশ্ন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে ব্যাংকটি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনসহ আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। তবে দীর্ঘ সময়ের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। অন্যথায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকের পুনরুদ্ধার শুধু একটি ব্যাংকের বিষয় নয়; এটি দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, আমানতকারীদের আস্থা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

