দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংকট আরও গভীর হয়েছে। বিশেষ করে খুচরা ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত এক বছরে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণসংবলিত ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পারিবারিক ঋণের চাপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের স্থবিরতা এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার আয় কমে যাওয়ায় অনেক গ্রাহক ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, খুচরা ঋণ পরিশোধে এই অবনতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তৈরি করলেও বিপুলসংখ্যক ছোট ঋণ হিসাব খেলাপি হয়ে পড়া সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রতিফলন এবং অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট বকেয়া ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের অনুপাতও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে যেখানে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে।
ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রভাব স্পষ্ট। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে কম।
এ ছাড়া ২০১৬ সালের পর প্রতিষ্ঠিত নতুন ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংক ছাড়া অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংকে গত এক বছরে খুচরা ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি খেলাপি হিসাবও বেড়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে কুটির শিল্প খাত সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় সর্বোচ্চ। পাশাপাশি ব্যবসা, কৃষি ও শিল্পসহ প্রায় সব খাতেই খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের সম্পদের গুণগত মান, ঋণ পুনরুদ্ধার সক্ষমতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে শুধু বড় ঋণগ্রহীতাদের নয়, ক্ষুদ্র ও খুচরা ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ঋণ অনুমোদনের আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

