এক দশক আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সুইফট পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করে ভুয়া বার্তার মাধ্যমে সেই অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে। এরপর থেকেই বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্ত করে এবং সুইফটও নিজেদের সিস্টেমে একাধিক সংস্কার আনে।
এবার সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সুইফট ব্যবস্থায় নতুন একটি স্তর যুক্ত করতে যাচ্ছে, যা মূলত অর্থপাচার প্রতিরোধে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবস্থা। এই নতুন টুলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সময় সন্দেহজনক কোনো তথ্য ধরা পড়লে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে সাময়িকভাবে আটকে দেওয়ার সক্ষমতা থাকবে। ফলে ভুয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে থেমে যাবে এবং যাচাই ছাড়া কোনো অর্থ স্থানান্তর সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর গঠিত বিশেষ পর্যালোচনা টাস্কফোর্সের সুপারিশেই এই প্রযুক্তি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সুইফট পরিচালনার নিরাপত্তা ঘর ও সার্বিক অবকাঠামোতেও পরিবর্তনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে সুইফট ব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়। সেখানে বলা হয়, অতীতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কাঠামো পর্যাপ্ত ছিল না এবং কোনো সমস্যা হলে পুরোনো সিস্টেমে ফেরার স্পষ্ট পরিকল্পনাও অনুপস্থিত ছিল। এসব ঘাটতি এখন ধাপে ধাপে দূর করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফায়ারওয়াল, ভার্চুয়াল সিস্টেম ডিজাইন, ব্যবহারকারীর প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত তালিকা হালনাগাদসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্ত করা হয়েছে।
নতুন এই এএমএল প্রযুক্তির মূল কাজ হবে সুইফটের মাধ্যমে আদান-প্রদান হওয়া প্রতিটি লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করা। এতে প্রেরক, প্রাপক, ব্যাংকের পরিচয় এবং দেশের তথ্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা তৈরি হবে এবং প্রয়োজন হলে লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। পরে সংশ্লিষ্ট কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তারা যাচাই শেষে অনুমোদন দিলে তবেই অর্থ ছাড় হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় নজরদারি এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কারণ বৈশ্বিক অর্থপাচার ও সাইবার অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শুধু প্রযুক্তি যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেটির নিয়মিত আপডেট ও দক্ষ মানবসম্পদ দিয়ে পরিচালনা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক মনে করেন, এ ধরনের প্রযুক্তি কার্যকর করতে হলে অভ্যন্তরীণ দক্ষ টিম গঠন জরুরি। বাইরে থেকে শুধু প্রযুক্তি কিনে আনা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নাও হতে পারে, কারণ অপরাধের ধরন নিয়মিত পরিবর্তিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সুপারিশ অনুযায়ী প্রযুক্তি ইতিমধ্যে ক্রয় সম্পন্ন হয়েছে। নতুন সুইফট সিস্টেম চালু হওয়ার পর এটিকে পুরোপুরি একীভূত করা হবে। ধাপে ধাপে সব নিরাপত্তা উপাদান যুক্ত করার কাজ চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দেশের রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। কর্তৃপক্ষের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে এ ধরনের উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

