দেশের চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প বর্তমানে গভীর আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৪৪.১৮ শতাংশ এখন খেলাপি হয়ে গেছে, যা দেশের বিভিন্ন শিল্প উপখাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমানে চামড়া শিল্পে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা।
একসময় তৈরি পোশাক শিল্পের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত হতো চামড়া শিল্প। কাঁচামালের সহজলভ্যতা, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী চাহিদার কারণে এই খাত নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ ছিল। কিন্তু নীতিগত দুর্বলতা, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, অবকাঠামোগত সংকট এবং দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. টিপু সুলতান বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর যে সুবিধাগুলো পাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের একটি বড় অংশ হারিয়ে গেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। এছাড়া হাজারীবাগে থাকা স্থায়ী সম্পদও এখন কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতেই দেশের মোট খেলাপি ঋণের ৪৮.৫১ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। এই খাতের মধ্যেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে চামড়া ও চামড়াভিত্তিক শিল্প। এর পরেই রয়েছে কৃষিভিত্তিক শিল্প, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩৯.৮০ শতাংশ। জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পে এই হার ৩৬.১৫ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক শিল্পে ৩১.১৫ শতাংশ।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, চামড়া শিল্পে খেলাপির হার বেশি হলেও মোট ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করছে না। কিন্তু কৃষিভিত্তিক শিল্প ও তৈরি পোশাক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ব্যাংক খাতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বাণিজ্য ও ব্যবসা খাতেও খেলাপি ঋণের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে এই খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৯.৫৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ২৭.৩৩ শতাংশ, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৪৯.৮৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ এখন “খারাপ ও লোকসানি ঋণ” শ্রেণিতে পড়ছে। ২০২৫ সালে মোট খেলাপি ঋণের ৯৩.৯৯ শতাংশই এই শ্রেণির ছিল। বছর শেষে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করে দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ (PCA) কাঠামো চালু করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও আইএনএফ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট এখন শুধু খেলাপি ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তার মতে, ঋণ পুনঃতফসিল বা নীতিগত সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে না।

