দেশের দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পথে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা হাজারো আমানতকারীর অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে পরিচালনা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে এবং পরে আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের স্বস্তি দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের সম্মতির ভিত্তিতে জনগণের করের অর্থ থেকে একটি বিশেষ তহবিল ব্যবহার করে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে। এ লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের জন্য চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে, সেগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীদের মধ্যে যাদের আমানতের পরিমাণ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত, তাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কাজ শুরু হবে। এরপর অবশিষ্ট আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, বছরের পর বছর লোকসান ও প্রশাসনিক ব্যয় বহন করে অচল প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার চেয়ে সুশৃঙ্খল অবসায়ন অধিক কার্যকর সমাধান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ বিতরণ করা ঋণের প্রায় পুরো অংশই আদায়ের বাইরে চলে গেছে। ফলে নতুন করে ব্যবসা পরিচালনা বা ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছর ধরে দুর্বল তদারকি, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ এবং নামে-বেনামে অর্থ আত্মসাতের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। এতে হাজার হাজার পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে এবং পুরো আর্থিক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসক নিয়োগের আগে প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হবে। এরপর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে সম্পদ ও দায় পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে পরিচালনার ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। ব্যাংক খাতে চলমান পুনর্গঠন কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে গত বছর বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী মূল্যায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারের গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা দেখাতে পারেনি, সেগুলোর বিরুদ্ধে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিভিন্ন ধাপের পর্যালোচনার পর বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে এই তালিকায় রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানান, দীর্ঘ এক যুগ ধরে ঝুলে থাকা এই সংকট নিরসনে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একযোগে কাজ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীরা অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়ার বাস্তব অগ্রগতি দেখতে পাবেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু হাজারো আমানতকারীর দুর্ভোগই কমবে না, আর্থিক খাতে জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তাও যাবে।

