দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে আবারও মূল্য সংযোজন কমার প্রবণতা দেখা গেছে। টানা দুই প্রান্তিক ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) রপ্তানি আয়ের মধ্যে দেশীয় অবদানের হার কমে প্রায় ৬১ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯২০ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫৬ কোটি ডলার। ফলে রপ্তানি আয়ের যে অংশ দেশে থেকে গেছে বা স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে, তার হার দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্য সংযোজনের হার একটি দেশের শিল্প খাত কতটা দেশীয় উপকরণ ও সেবার ওপর নির্ভরশীল, তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই হার যত বেশি হয়, রপ্তানি থেকে দেশের প্রকৃত আয়ও তত বাড়ে। বিপরীতে মূল্য সংযোজন কমে গেলে বোঝা যায়, উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে অথবা রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ৯৭৫ কোটি ডলার। তৃতীয় প্রান্তিকে সেই আয় কমে যায় প্রায় ৫৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ একদিকে রপ্তানি আয় কমেছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে মূল্য সংযোজনের হারও নিম্নমুখী হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক পোশাক খাতের মূল্য সংযোজন হিসাব করার সময় মোট রপ্তানি আয় থেকে তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক উপকরণ এবং অন্যান্য আমদানিকৃত কাঁচামালের ব্যয় বাদ দেয়। অবশিষ্ট অংশকে স্থানীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়া প্রকৃত মূল্য হিসেবে ধরা হয়। এ কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ এই হিসাবকে খাতটির প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সূচক হিসেবেও বিবেচনা করেন।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, গত কয়েক বছরে তৈরি পোশাক খাতে মূল্য সংযোজনের হার ওঠানামা করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৬৭ শতাংশের বেশি হয়েছিল। পরবর্তী কয়েকটি প্রান্তিকে তা ৭০ থেকে ৭২ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করে। তবে পরে রপ্তানি পরিসংখ্যানে সংশোধন আনার পর দেখা যায়, প্রকৃত চিত্র ভিন্ন ছিল এবং মূল্য সংযোজনের হার আবার ৬২ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি তথ্যের পরিসংখ্যানগত সমন্বয়ের কারণে অতীতে মূল্য সংযোজনের যে উচ্চ হার দেখা গিয়েছিল, তার একটি অংশ বাস্তব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন ছিল না। তথ্য সংশোধনের পর এখন তুলনামূলক বাস্তব চিত্র সামনে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার ৬১৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। ওই সময়ে কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার। ফলে মূল্য সংযোজনের হার ছিল ৬০ শতাংশ। পরবর্তী অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারে পৌঁছালেও কাঁচামাল আমদানিও বেড়ে যায়। ফলে মূল্য সংযোজনের হার সামান্য কমে ৫৯ শতাংশে দাঁড়ায়।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের সামগ্রিক চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। এই সময়ে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮৮৭ কোটি ডলার। এর বিপরীতে কাঁচামাল আমদানি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৮ কোটি ডলারের। সেই হিসাবে প্রথম তিন প্রান্তিক মিলিয়ে পোশাক খাতে মূল্য সংযোজনের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে সুতা, কাপড় ও অন্যান্য উপকরণ উৎপাদন বাড়ানো গেলে মূল্য সংযোজনের হার আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি রপ্তানি আয়ের বড় অংশ দেশেই থেকে যাবে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নেও জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদেশগুলোর চাহিদার পরিবর্তন এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অধিক সুবিধা পেতে হলে শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়, বরং সেই রপ্তানি থেকে দেশীয় অর্থনীতিতে কতটা মূল্য যুক্ত হচ্ছে, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

