দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রতি গ্রাহক ও আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ব্যাংকটির মালিকানা, পরিচালনা ব্যবস্থা এবং অতীতের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের কারণে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দূর করতে এখন একটি স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনা পর্ষদ গঠনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংক খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; দেশের লাখো আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তার সঙ্গে এর সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। ফলে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা ও সুশাসন পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপরও প্রভাব ফেলে। এ কারণে আস্থা সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাকে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম ব্যাংকটির কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে মাঠে নেমেছে। সংগঠনটির মতে, শুধুমাত্র প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য তারা সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটির নেতারা বলছেন, পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব থাকলে প্রকৃত অর্থে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব অত্যন্ত জরুরি। তাদের মতে, গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রথম শর্ত হলো ব্যাংক পরিচালনায় পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া গ্রাহক, আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডাররা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও বিতর্কের কারণে ব্যাংকটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ বিতরণে অনিয়ম, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং বিপুল অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ইসলামী ব্যাংককে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। এসব ঘটনার প্রভাব শুধু ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর নয়, গ্রাহকদের মনস্তত্ত্বেও পড়েছে। অনেক আমানতকারী তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন।
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে তারল্য সহায়তা ও নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে, তবুও আস্থার ঘাটতি পুরোপুরি দূর হয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আস্থা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ, যা শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, বঞ্চিত শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার পুনর্বহাল, ব্যাংকসংক্রান্ত অনিয়মের তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, দায়ীদের দ্রুত বিচার, বেরিয়ে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার এবং বিতর্কিত নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকা। সংগঠনটির মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকটির প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকটির সংকট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কারণ দেশের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে স্থিতিশীলতা ফিরলে তা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে তিনটি বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন। পাশাপাশি অতীতের অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বার্থসংশ্লিষ্টদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, ব্যাংকের পরিচালনায় গ্রহণযোগ্য ও স্বাধীন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসবে। আর সেই আস্থাই হবে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতেও করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ একটি ব্যাংকের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে গ্রাহকের বিশ্বাস, পরিচালনার স্বচ্ছতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।

