ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের মোট ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।
অর্থবছরের শুরুতে মূল বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে অর্থায়নের প্রয়োজন বাড়তে থাকায় জুন মাসে সংশোধিত বাজেটে সেই লক্ষ্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট বকেয়া ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। ২৩ জুন পর্যন্ত নিট ঋণ বেড়েছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের বাকি দিনগুলোতে তা আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সময় অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের গতি বাড়ে। এ সময়ে পরিচালন ব্যয় এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন জোরদার হলেও প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় হয়নি।
তাদের মতে, পুরো অর্থবছরজুড়ে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় তারল্যের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি না করেই সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিতে সক্ষম হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়লে সরকারের অর্থায়নের জন্য রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকঋণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ওই অর্থবছরে লক্ষ্য ছিল ৯৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকার ঋণ নেয় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কম ছিল। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকঋণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি হয়েছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারি ব্যয় মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
তার মতে, সরকার অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ নিলে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাবের কারণে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় এর প্রভাব সীমিত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তাই কর প্রশাসনের দুর্বলতা দূর করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরামর্শ দেন তিনি।
মে ও জুন মাসে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা উন্নতি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে।
এনবিআরের প্রাথমিক হিসাবে, অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশের পর আদায়ের পরিমাণ আরও কিছুটা বাড়তে পারে। এতে রাজস্ব ঘাটতি কমবে এবং বার্ষিক প্রবৃদ্ধিও উন্নত হতে পারে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় বাড়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকঋণের পরিমাণও বেড়েছে।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের দুর্বল কার্যক্রম রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে সরকারি বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট কর আদায়ও কম হয়েছে।
তবে চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতের কার্যক্রম ও রাজস্ব আদায় ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে জনগণের সঞ্চয় থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং স্বল্পসুদে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সরকারের রাজস্বের বড় একটি অংশ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন ধীর হওয়ায় রাজস্ব আদায়ও প্রত্যাশিত হয়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৪৮ শতাংশ। গত ১৬ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার ঘাটতির কারণে নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে কর আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। আরও সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হতো।

