দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন (ডামা) কার্যকর হলে বেসরকারি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ কিনে তা পুনর্গঠন, আদায় এবং প্রয়োজনে জামানত বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধার করতে পারবে।
সরকারের আশা, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকের অচল সম্পদ কমবে, নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়বে এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতে গতি ফিরবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার পর আইনটি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান সংকটাপন্ন ঋণের চাপ মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি আধুনিক ও বাজারভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলাই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য।
বর্তমানে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, অর্থঋণ আদালতের জটিলতা, সম্পদ বিক্রিতে বিলম্ব এবং দুর্বল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা বছরের পর বছর আটকে থাকে। এর প্রভাব পড়ে ব্যাংকের স্থিতিপত্রে, কমে যায় নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বাড়ে চাপ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ, অবলোপন করা ঋণ, পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ মিলিয়ে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেছেন, সাধারণত খসড়া আইনের ওপর খুব বেশি মতামত আসে না। তবে ডামা আইন নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে গঠনমূলক মতামত পাওয়ার আশা করছে সরকার।
প্রস্তাবিত আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই ইউনিট লাইসেন্স প্রদান, তদারকি, নির্দেশনা জারি, জরিমানা আরোপ এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা পাবে। প্রশাসনিকভাবে এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকলেও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
এই ইউনিটের অনুমোদন নিয়ে বেসরকারি খাতে গড়ে উঠবে সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি। পাশাপাশি থাকবে ঋণ সেবাদাতা কোম্পানি, যারা ঋণ পুনর্গঠন, ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সমঝোতা, সম্পদের মূল্যায়ন, তথ্য সংগ্রহ এবং আইনি কার্যক্রমে সহায়তার মতো কাজ করবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো নিজেরাই খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে অথবা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করে। নতুন আইনের আওতায় ব্যাংক চাইলে খেলাপি ঋণ বিশেষায়িত কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারবে। এরপর ওই কোম্পানি ঋণ পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন, জামানত ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আদায় করবে। এর মাধ্যমে দেশে খেলাপি ঋণ কেনাবেচার একটি বিশেষায়িত বাজার গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি শুধু ঋণ কিনেই দায়িত্ব শেষ করবে না। প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতার ব্যবসা পুনর্গঠন, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর, ব্যবসার পুরো বা আংশিক অংশ বিক্রি কিংবা ইজারা দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিতে পারবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র জামানত বিক্রি নয়, ব্যবসাকে সচল রেখে ঋণ উদ্ধারের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঋণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পুনঃতফসিল, সমঝোতা, সম্পদ অনুসন্ধান, মূল্যায়ন এবং আদালতের মামলায় সহায়তা দিতে পারবে। তবে তারা জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে না, নিজেরা বাদী হয়ে মামলা করতে পারবে না এবং কোনো ধরনের বেআইনি বা জোরপূর্বক ঋণ আদায়ের সুযোগও থাকবে না।
খসড়া আইনে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের জন্য কঠোর শর্তও রাখা হয়েছে। কোম্পানিকে কোম্পানি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে, নির্ধারিত পরিমাণ মূলধন থাকতে হবে এবং পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি, আইন অথবা সম্পদ পুনরুদ্ধার বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ সদস্যকে স্বাধীন পরিচালক রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
নতুন আইনে খেলাপি ঋণকে আর্থিক সম্পদে রূপান্তরের সুযোগও রাখা হয়েছে। একাধিক খেলাপি ঋণ একত্র করে তার বিপরীতে বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক সিকিউরিটি ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, যৌথ উদ্যোগ এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ তহবিলের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথভাবে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার তহবিল গঠনও সম্ভব হবে। তবে এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।
নজরদারির বিষয়েও আইনে বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে। সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট যেকোনো সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তথ্য, নথি ও হিসাব চাইতে পারবে। প্রয়োজন হলে নিরীক্ষা, পরিদর্শন কিংবা তদন্ত পরিচালনা করা যাবে। আইন বা লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করলে জরিমানা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, এমনকি লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ক্ষমতাও থাকবে। তবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান মনে করেন, আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে অন্তত তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোকে বাজারমূল্যে সংকটাপন্ন ঋণ কিনে পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে লাভজনকভাবে পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি ঋণ কেনাবেচা ও হস্তান্তরের আইনি জটিলতা দূর করতে হবে এবং জামানত ও সংশ্লিষ্ট আইনি অধিকার নির্বিঘ্নে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে স্থানান্তরের সুস্পষ্ট বিধান থাকতে হবে।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অচল ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। এতে ব্যাংকের স্থিতিপত্র আরও শক্তিশালী হবে, নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহও বাড়তে পারে।
অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, অতীতেও কিছু সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও আইনি দুর্বলতার কারণে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাঁর আশা, নতুন আইন সেই সীমাবদ্ধতা দূর করে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে একটি কার্যকর ও টেকসই কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

