বিদেশে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশে চিকিৎসার জন্য পূর্বানুমতি ছাড়া অর্থ পাঠানোর সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার ডলার করায় এ খাতে বৈধ লেনদেন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চার বছরের ব্যবধানে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক পথে বিদেশে পাঠানো অর্থ প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে চিকিৎসায় বাংলাদেশিদের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় এই পরিমাণ এখনো খুবই কম। কারণ, বড় অঙ্কের অর্থ এখনো হুন্ডি বা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে বিদেশে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈধ পথে পাঠানো হয়েছিল প্রায় ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার। পরের অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ডলারে। এরপর পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈধ পথে চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ এক লাফে ১ কোটি ডলারে পৌঁছে যায়। আর সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র চার বছরে বৈধ পথে চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদেশে চিকিৎসার জন্য অর্থ পাঠানোর নীতিমালায় পরিবর্তনের প্রভাবই এই প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে ১০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি পাঠাতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হতো। সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সেই অনুমোদন পাওয়া সহজ ছিল না। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থ বিদেশে নিতে অনেকেই হুন্ডি বা অন্য অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা যেমন কম ছিল, তেমনি রোগী ও স্বজনদের জন্য বাড়তি ঝুঁকিও তৈরি হতো।
পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য ডলার ছাড়ের সীমা বাড়িয়ে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আলাদা অনুমতি ছাড়াই ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ছাড় করতে পারে। এ অর্থ হাসপাতালের নামে পাঠানো কিংবা আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহার করে ব্যয় করা সম্ভব। একই সঙ্গে এই সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার নগদ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। তবে ১৫ হাজার ডলারের বেশি প্রয়োজন হলে আগের মতোই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যবহার বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব রোগীর চিকিৎসা ব্যয় ১৫ হাজার ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাঁদের আর বাড়তি অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে হাসপাতাল ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট খরচ পরিশোধ করাও এখন সহজ হয়েছে।
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের গন্তব্যেও গত দুই বছরে পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতীয় ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের ভিসা সীমিত থাকায় অনেক রোগী বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন। এসব দেশে চিকিৎসার ব্যয় ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল্যও বেড়ে যায়। ফলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারা মনে করেন, বর্তমান নীতিমালায় ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও আরও কিছু সংস্কারের সুযোগ রয়েছে। তাঁদের মতে, রোগীর চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও হাসপাতালের প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে নির্দিষ্ট সীমার বেশি অর্থ ছাড়ের ক্ষমতা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে দিলে বৈধ লেনদেন আরও বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এড়ানো সম্ভব হবে এবং রোগীদের অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও কমবে।
তাঁদের আরও মত, সব ধরনের রোগের ক্ষেত্রে নয়, অন্তত জটিল ও ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। এতে রোগীরা প্রয়োজনীয় অর্থ দ্রুত বিদেশে পাঠাতে পারবেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
তবে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ বাড়লেও বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন গবেষণা ও খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকার সমান। এই বিপুল ব্যয়ের তুলনায় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার অত্যন্ত সামান্য অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ রোগী বিদেশে যাওয়ার সময় পর্যটন ভিসা ব্যবহার করেন। অনেকেই প্রয়োজনীয় অর্থ নগদ বহন করেন বা বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের সহায়তা নেন। আবার বড় একটি অংশ এখনো হুন্ডির মাধ্যমে অর্থের ব্যবস্থা করেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ দেশের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিদেশে চিকিৎসার কারণে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চিকিৎসার জন্য ব্যয় হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ায় দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রাও বাইরে চলে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈধ অর্থ প্রেরণ সহজ করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উন্নত চিকিৎসা দেশের মধ্যেই নিশ্চিত করা গেলে বিদেশমুখী রোগীর সংখ্যা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও হ্রাস পাবে। পাশাপাশি জটিল রোগের চিকিৎসা অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ চিকিৎসক ও আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।

