দেশের ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ১৮ মাসের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাস ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হবে। এরপরের ১২ মাসে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর করে খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ পরিকল্পনার কথা জানান। সম্প্রতি ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুমোদিত হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ৬১টি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এসব ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশই খেলাপি।
অতীতের তুলনায় খেলাপি ঋণের এই বৃদ্ধি ব্যাংক খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। পরবর্তীতে ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এবং বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার কারণে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সব খেলাপি ঋণকে একইভাবে বিবেচনা না করে প্রথমে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে সমঝোতার সুযোগ তৈরি করা। এর মাধ্যমে যেসব ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা প্রকৃত অর্থে আর্থিক সংকটে পড়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে একই ধরনের সুযোগ দীর্ঘায়িত না করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খেলাপি ঋণের বড় সমস্যা শুধু ঋণ পরিশোধ না করা নয়; অনেক ক্ষেত্রে ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী কে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করে তাঁদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহার হয়েছে এবং কারা প্রকৃতপক্ষে এর সুবিধা নিয়েছেন, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে বড় অঙ্কের ঋণের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন গভর্নর। একই সঙ্গে ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারক করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এতে একদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ঋণের কার্যকর সুদের হার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণের প্রকৃত সুদের হার ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ ছাড়া ইউপিএএস বা মেয়াদি ঋণপত্রের অর্থায়ন ব্যবস্থায় সুদের মার্জিন বেঞ্চমার্ক ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার সিদ্ধান্তের কথাও বৈঠকে জানানো হয়। ব্যাংকের সুদের স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে রাখার বিষয়েও সিদ্ধান্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপ আমদানি ব্যয় ও ঋণের সুদহার কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বৈঠকে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এই অর্থ যেন প্রকৃত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যেন যথাযথভাবে তা ব্যবহার করতে পারেন, সে বিষয়ে তদারকি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে অগ্রগতির তথ্য উপস্থাপন করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত ছয় মাস মেয়াদে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মুদ্রানীতি প্রতি তিন মাসে পর্যালোচনা করা হবে। অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ ও ব্যাংক খাতের অবস্থার সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্তকে আরও দ্রুত সমন্বয় করাই এর উদ্দেশ্য।
খেলাপি ঋণ কমাতে সমঝোতার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগকে সফল করতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ঋণখেলাপিদের শ্রেণিবিন্যাস। প্রকৃত ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে যারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দিচ্ছেন না—দুই পক্ষকে একইভাবে বিবেচনা করলে সংস্কারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
তাই প্রথম ছয় মাসের সমঝোতা পর্বে স্বচ্ছ যাচাই, প্রকৃত ঋণগ্রহীতার পরিচয় নির্ধারণ এবং ঋণের অর্থের ব্যবহার অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে পরবর্তী ১২ মাসে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দ্রুততা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮ মাসের পরিকল্পনার মূল পরীক্ষা তাই শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো নয়; বরং ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া, ঋণের ব্যবহার, আদায়ব্যবস্থা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে জবাবদিহির একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা।

