দেশে নগদবিহীন লেনদেনের প্রসার দ্রুত বাড়ছে। ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের ফলে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে ইস্যুকৃত বিভিন্ন ধরনের কার্ডের সংখ্যা ৫ কোটিরও বেশি। এর মধ্যে ডেবিট কার্ডে সবচেয়ে বড় অবস্থান ধরে রেখেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, আর ক্রেডিট কার্ড সেবায় শীর্ষে রয়েছে সিটি ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মে মাসভিত্তিক কার্ড লেনদেন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৪৭ হাজার ৮০১। ২০২১ সালের জুনে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩৩ লাখ ৬৩ হাজার ৭০২। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধু কার্ডের সংখ্যাই নয়, বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণও। ২০২১ সালের জুনে ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ২১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে সেই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫৫ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পাঁচ বছরে এ খাতে লেনদেনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৫৮ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট ডেবিট কার্ডের প্রায় ৭৭ শতাংশই শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার ১৫২টি ডেবিট কার্ড ইস্যু করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে এটিএম নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ডেবিট কার্ডভিত্তিক সেবা জোরদারের কারণে ব্যাংকটি এ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে দেশজুড়ে সবচেয়ে বড় এটিএম নেটওয়ার্কও পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডেবিট কার্ড ইস্যুর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, যার কার্ডের সংখ্যা ৬৯ লাখ ৫৫ হাজার ২১০। এরপর রয়েছে পূবালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক। শীর্ষ ১০-এর তালিকায় আরও রয়েছে সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং ট্রাস্ট ব্যাংক।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহতেশামুল হক খান বলেন, শুরু থেকেই ব্যাংকটি ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে প্রিমিয়াম ক্রেডিট কার্ড, করপোরেট কার্ড এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে অনলাইন কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, বিদেশ ভ্রমণ এবং তাৎক্ষণিক অর্থ ব্যবহারের সুবিধার কারণে ক্রেডিট কার্ডের জনপ্রিয়তাও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫১। এছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের ইস্যুকৃত ক্রেডিট কার্ড রয়েছে ৯২ হাজার ১৯৮টি।
ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেও লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালের জুনে এ খাতে প্রায় ১ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে তা বেড়ে ৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১৩৯ শতাংশ।
ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর দিক থেকে দেশের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির ইস্যুকৃত ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩৯২। বিশ্বের পরিচিত কার্ড ব্র্যান্ড ‘আমেরিকান এক্সপ্রেস’-এর একমাত্র বাংলাদেশি অংশীদার হওয়ায় এ খাতে ব্যাংকটির অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। পাশাপাশি ভিসা ও মাস্টারকার্ডের সেবাও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান মো. অরূপ হায়দার বলেন, কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সম্প্রসারণ শুধু ব্যাংকিং খাতের আধুনিকায়নের প্রতিফলন নয়, বরং দেশের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। তাঁর মতে, নিরাপদ, দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ের পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।
ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যার কার্ড সংখ্যা ৩ লাখ ৬ হাজার ৭৩৪। এরপর রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। শীর্ষ ১০-এর তালিকায় আরও রয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং ব্যাংক এশিয়া।
ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহারও বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে প্রিপেইড কার্ড রয়েছে ৮৬ লাখ ১ হাজার ১৬৬টি। এ খাতে সবচেয়ে বেশি ৭৪ লাখ ৮৭ হাজার ২৩টি কার্ড ইস্যু করেছে ইসলামী ব্যাংক।
সব ধরনের কার্ড মিলিয়ে বর্তমানে দেশে ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ ৯১ হাজার ১৬টি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি সম্প্রসারণ, ই-কমার্সের বিকাশ, এটিএম ও পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি এবং গ্রাহকদের নগদবিহীন লেনদেনে আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে আগামী বছরগুলোতে কার্ডভিত্তিক লেনদেন আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।

