বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ লক্ষ্যমাত্রার ৮৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ সময়ে সরকার মূলত ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ঋণ সংগ্রহ করেছে। বিপরীতে জাতীয় সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের প্রকাশিত ‘মাসিক প্রতিবেদন অন গভর্নমেন্ট ডোমেস্টিক বোরোয়িং-এপ্রিল ২০২৬’ অনুযায়ী, জুলাই-এপ্রিল সময়ে সরকারের নিট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। পুরো অর্থবছরের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে।
গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের নিট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ৮১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রথম ১০ মাসেই ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া ঋণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সরকারি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বাড়ায় ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে জুলাই-এপ্রিল সময়ে সরকারের নিট ঋণ হয়েছে মাত্র ৭৬৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ৩১ হাজার ৫৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণ কমার অন্যতম কারণ জাতীয় সঞ্চয়পত্রে সরকারের নিট ঋণ ঋণাত্মক হওয়া। জুলাই-এপ্রিল সময়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৭৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে পরিশোধ করতে হয়েছে ৭৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে সরকারকে নিট ৪২৯ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
শুধু এপ্রিল মাসের হিসাবেও ঋণ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন দেখা গেছে। ওই মাসে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৫ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। তবে একই সময়ে পরিশোধ করেছে ৩০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। ফলে এপ্রিল শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের নিট পরিশোধ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকার ১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা নিট ঋণ সংগ্রহ করেছে।
প্রতিবেদনে শরিয়াহভিত্তিক সরকারি অর্থায়নের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ডের নিট স্থিতি জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৬ হাজার ৬১১ কোটি টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুকের স্থিতি এপ্রিল শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপও বাড়তে পারে। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ বলেন, সরকারের নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ ইতোমধ্যে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এটি আরও বাড়লে বাজেটের বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কারণে ঋণ গ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

