চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর কৃষকদের স্বস্তি দিতে নেওয়া সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগের বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) জানিয়েছে, গত পাঁচ মাসে দেশের ৪৮টি জেলার ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষকের মোট ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক দীর্ঘদিনের ঋণের দায় থেকে মুক্ত হয়ে আবারও নিয়মিত ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসার সুযোগ পাচ্ছেন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করতে গত কয়েক মাস ধরে তথ্য যাচাই-বাছাই, হিসাব সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতের কৃষকেরা এ সুবিধার আওতায় আসবেন। সরকারের হিসাবে এ কর্মসূচির মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফ হওয়ার কথা, যার সুবিধা পাবেন প্রায় ১২ লাখ কৃষক।
সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক একাই সরকারের ঘোষিত মোট ঋণ মওকুফের প্রায় ৩৯ শতাংশ সম্পন্ন করেছে। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিতরণ হওয়া মোট কৃষিঋণের প্রায় ৬৩ শতাংশই এককভাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রদান করে থাকে। ফলে কৃষকদের জন্য নেওয়া এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
ব্যাংকটির মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী ঋণের বোঝা অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য শুধু আর্থিক নয়, মানসিক চাপও তৈরি করেছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের বাজারে অস্থিরতা এবং নানা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। ফলে তাঁদের নামে খেলাপি ঋণ থাকায় নতুন করে কৃষিঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছিল।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে তথ্য যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে ঋণ মওকুফ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পুরোনো ঋণের দায়মুক্ত হয়েছেন। এখন তাঁরা আবার নিয়মিত ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারবেন এবং নতুন করে কৃষিঋণ নিয়ে কৃষি উৎপাদনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ঋণমুক্তির এ উদ্যোগ কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পুরোনো ঋণের বোঝা কমে গেলে কৃষকেরা নতুন মৌসুমে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও পুনঃস্থাপিত হবে, যা কৃষি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে তাঁরা মনে করেন, ঋণ মওকুফের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সহজ শর্তে নতুন ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও কৃষকদের জন্য একাধিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালু, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, জনগণের অংশগ্রহণে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার এবং প্রতিবছর ৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি।
বাংলাদেশে কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নতুন নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের মেয়াদে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের মূলধন ও সুদ মওকুফ করা হয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও কৃষকদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলো।
এদিকে কৃষিঋণ বিতরণেও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ কৃষিঋণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে) ব্যাংকটির কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে তারা ৯ হাজার ৮১ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১ হাজার ২৮১ কোটি টাকা বেশি ঋণ বিতরণ করে ব্যাংকটি কৃষি অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

