বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনে নিজস্ব প্রধান কার্যালয়ের একটি অংশ বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দেওয়ার সুযোগ পেল ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি। রাজধানীর পান্থপথে নির্মাণাধীন ‘এনবিএল টুইন টাওয়ার’-এর টাওয়ার-২ অংশ ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভাড়া বা ইজারা দিতে পারবে ব্যাংকটি।
এ লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর একটি নির্দিষ্ট বিধানের প্রয়োগ থেকেও সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবনের অব্যবহৃত অংশ থেকে নিয়মিত আয় নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ (বিআরপিডি-২) মঙ্গলবার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারায় অর্পিত ক্ষমতা ব্যবহার করে এই বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর পান্থপথে বীর উত্তম সি. আর. দত্ত রোডের ১/সি/১ হোল্ডিং নম্বরে অবস্থিত ন্যাশনাল ব্যাংকের মালিকানাধীন ‘এনবিএল টুইন টাওয়ার’-এর টাওয়ার-২ অংশ বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া বা ইজারা দেওয়া যাবে। অর্থাৎ ভবনের এই অংশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক সংস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি ভিত্তিতে জায়গা ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারবে ব্যাংকটি।
একই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারার বিধান, যা ২০২৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত আইনেও বহাল রয়েছে, সেটি ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর হবে না। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবনটির টাওয়ার-২ অংশ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত জটিলতা থাকবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, অনুমোদন কার্যকর হওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও চুক্তিগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ব্যাংকটি ইজারা কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
ব্যাংকিং খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু ঋণ কার্যক্রম নয়, বিকল্প উৎস থেকে আয় বাড়ানোর দিকেও ব্যাংকগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে বড় আকারের প্রধান কার্যালয় বা বাণিজ্যিক ভবনের অনেক অংশ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে সেগুলো থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় না। কিন্তু সেই জায়গা ভাড়া বা ইজারা দিলে নিয়মিত নগদ প্রবাহ তৈরি হয়, যা একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, একটি ভবন নির্মাণ বা রক্ষণাবেক্ষণে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়। ভবনের অব্যবহৃত অংশ থেকে আয় না এলে সেই ব্যয়ের পুরো চাপ প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হয়। কিন্তু ইজারা থেকে নিয়মিত আয় শুরু হলে ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন ব্যয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খরচের একটি অংশ সহজেই সমন্বয় করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে স্থাবর সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার কারণে সম্পদ ব্যবস্থাপনাও আরও দক্ষ ও লাভজনক হয়ে ওঠে।
তাদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং অপ্রচলিত উৎস থেকে আয় বৃদ্ধির মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নিজস্ব সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত ব্যাংকের মালিকানাধীন ভবনগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য ভাড়া আয় অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের অনুমোদন কেবল একটি ভবন ইজারা দেওয়ার সুযোগই নয়, বরং সম্পদ ব্যবহারে আরও বাস্তবভিত্তিক ও দক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এতে ব্যাংকের অনাব্যবহৃত স্থাবর সম্পদ আয় উৎপাদনকারী সম্পদে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে পরিচালন দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই সুবিধা স্থায়ী নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিশেষ অব্যাহতি ও বাণিজ্যিক ইজারার অনুমোদন ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিদ্যমান আইন, বিধি এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার আলোকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

