দেশের ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি বা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের তথ্য গোপনীয়ভাবে সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে পারবেন অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষকরা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ইন্টারনাল কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইসিএমএস) নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। নতুন এই নীতিমালার মাধ্যমে ২০১৬ সালে জারি করা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালনসংক্রান্ত নির্দেশনা বাতিল করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, পরিপালন বা কমপ্লায়েন্স এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে তিনটি বিভাগের দায়িত্ব ও কার্যক্রম আলাদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগে অনেক ব্যাংকে একই কর্মকর্তার অধীনে নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় এসব বিভাগের প্রধান আলাদা থাকবেন এবং তারা সমমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করবেন। এর ফলে কোনো অনিয়ম শনাক্ত হলে তা আরও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকের হেড অব ইন্টারনাল অডিট এখন থেকে সরাসরি পরিচালনা পর্ষদের অডিট কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দেবেন। এতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের স্বাধীনতা বাড়বে এবং কোনো ধরনের চাপ ছাড়াই নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার মাধ্যমে যদি কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি গোপনীয়ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি বিভাগকে জানাতে হবে।
এ জন্য ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ফলে ব্যাংকের ভেতরের অনিয়ম শনাক্ত ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের স্বাধীনতা আরও বাড়বে।
এছাড়া প্রতিটি তফসিলি ব্যাংককে অভিযোগ গ্রহণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে হটলাইন, ই-মেইল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অথবা সিলগালা করা লিখিত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অভিযোগকারীর পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখতে হবে। পর্যাপ্ত তথ্য থাকলে পরিচয় প্রকাশ না করেও করা অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনা যাবে। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগকারীকে হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম শনাক্তে হুইসেলব্লোয়ার ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই অনিয়মের তথ্য দ্রুত পাওয়া যায় এবং বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নতুন নির্দেশনায় প্রযুক্তিনির্ভর নিরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে ফরেনসিক অডিট, কনকারেন্ট অডিট এবং ভার্চুয়াল অডিট চালুর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকি শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে অর্থপাচার, ঋণ জালিয়াতি, সাইবার ঝুঁকি এবং আর্থিক অনিয়ম শনাক্তে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন ব্যবস্থার ফলে পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম আরও বেশি নজরদারির মধ্যে আসবে। এতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সব তফসিলি ব্যাংককে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পরিবর্তন সম্পন্ন করে নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে।

