দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও ঋণখেলাপির সংখ্যা—দুটিই উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে ঋণখেলাপির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই পরিস্থিতির জন্য মূলত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং কয়েকটি বড় করপোরেট গ্রুপ দায়ী।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চভিত্তিক খেলাপি ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। একই বছরের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ৩১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি বছরের মার্চে এই হার আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, খেলাপি ঋণের এ ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং কয়েকটি বড় করপোরেট গ্রুপের অনাদায়ী ঋণই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
প্রতিবেদন বলছে, গত বছরের মার্চে দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল প্রায় ২২ লাখ। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ৪৬ লাখে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরে খেলাপির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঋণগ্রহীতাদের মধ্যেই খেলাপির হার সর্বোচ্চ। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ১ হাজার ৪৭৮ জন। চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫ জনে। একই সময়ে এই শ্রেণির খেলাপি ঋণের হার ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় সাড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক বছরে এ হার প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
তবে শুধু বড় ঋণগ্রহীতারাই নয়, ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের মধ্যেও খেলাপির প্রবণতা বাড়ছে। ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যা গত বছরের মার্চে ছিল প্রায় সাড়ে ২১ লাখ, যা চলতি বছরের মার্চে বেড়ে প্রায় সাড়ে ৪৫ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে এ শ্রেণির খেলাপি ঋণের হার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, ছোট ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপি বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পারিবারিক ঋণের চাপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মন্থরতা এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়া।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৪৫ শতাংশ শিল্প খাতে এবং ৩২ শতাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে দেওয়া হয়েছে। এই দুই খাতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ ঋণ বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উভয় খাতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। প্রায় সব ধরনের শিল্প ও ব্যবসা খাতেই খেলাপির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে বাণিজ্য, শিল্প ও কৃষি—এই তিনটি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বড় অঙ্কের অনাদায়ী ঋণ দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে ছোট ঋণেও খেলাপির হার বাড়তে থাকায় আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বিস্তৃত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

