দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন থাকলেও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেনি। বরং চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশটিতে পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ভারতে ৩৩ কোটি ৫২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ১৩ লাখ ডলার।
বাংলাদেশের প্রধান অপ্রচলিত রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে ভারতের বাজারেই এই সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে চীন ও অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৫১ শতাংশ করে। অন্যদিকে জাপানে রপ্তানি সামান্য কমেছে।
গত দুই বছরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে একাধিক ঘটনায় উত্তেজনা তৈরি হলেও বাণিজ্যে তার পুরো প্রভাব পড়েনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত বদলে যায়। এরপর তিনি ভারতে অবস্থান নেওয়ায় সম্পর্ক আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে হিন্দু ধর্মীয় নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। ত্রিপুরায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কিছু রাজনৈতিক নেতা বাংলাদেশবিরোধী বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যাংককে এক আঞ্চলিক সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক করলেও সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য উষ্ণতা ফেরেনি।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই ভারত তৃতীয় দেশে রপ্তানির জন্য বাংলাদেশি পণ্য ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করে পরিবহনের যে সুবিধা পেত, তা প্রত্যাহার করে নেয়।
পরবর্তী সময়ে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক আমদানিতে ভারত বিধিনিষেধ আরোপ করে। এসব পণ্য শুধু নির্দিষ্ট সমুদ্রবন্দর দিয়ে প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়। একই সঙ্গে ফল, স্বাদযুক্ত পানীয়, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিকপণ্য, সুতা, আসবাব এবং কয়েক ধরনের অন্যান্য পণ্য আমদানিতেও বিভিন্ন স্থল শুল্ককেন্দ্রে সীমাবদ্ধতা দেওয়া হয়।
পরে পাট, পাটজাত পণ্য এবং কাপড়ের ওপরও কিছু বিধিনিষেধ বাড়ানো হয়। অথচ ভারতের বাজারে বাংলাদেশের বড় অংশের পণ্য স্থলবন্দর দিয়েই যায়, যার মধ্যে বেনাপোল অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ।
বাংলাদেশও নিজস্ব বস্ত্র ও সুতা শিল্প সুরক্ষার কথা বলে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
দুই দেশের উত্তেজনা ক্রীড়াঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতার একটি দল থেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট কর্তৃপক্ষও কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায়।
তারপরও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখিয়েছে।
ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১৯৯ কোটি ডলারে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে তা কমে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি নেমে আসে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারে।
এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার রপ্তানি বেড়ে প্রায় ১৭৬ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামান্য কমে তা প্রায় ১৭৫ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
ভারতের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য, প্লাস্টিকপণ্য, সুতা এবং বিভিন্ন ধরনের বস্ত্রপণ্য।
ভারতের বাজার থেকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে তৈরি পোশাক থেকে। পাট ও পাটজাত পণ্যের অবদান প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে তুলনামূলক কম দামের কারণে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের প্রতি ভারতের চাহিদা ধরে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বাজার ধরে রাখতে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসন না হলে রপ্তানিকারকদের উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে রপ্তানি বাড়ার প্রবণতা ইতিবাচক হলেও দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা বাড়ানো, দরকষাকষির দক্ষতা উন্নত করা এবং ভারতের বাজারে অশুল্ক বাধা কমাতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক দিক নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সাম্প্রতিক রপ্তানি তথ্য দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক স্বার্থ এখনো বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সচল রেখেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক সম্পর্ক, সীমান্ত বাণিজ্য নীতি এবং দুই দেশের ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্তের ওপর।

