আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামা থেকে আমদানিকারকদের সুরক্ষা দিতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ ‘গাইডলাইনস অন হেজিং অব কমোডিটি প্রাইস রিস্ক ফর ইমপোর্ট ট্রেডস ইন ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটস, ২০২৬’ নামে একটি নির্দেশনা জারি করেছে। ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭-এর ২০(৩) ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে জারি করা এই নির্দেশনায় অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে যোগ্য আমদানিকারকদের জন্য পণ্যের মূল্যঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুবিধা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়লেও আমদানিকারকরা আগেই দাম নির্ধারণ করে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবেন।
সহজ ভাষায়, হেজিং হলো ভবিষ্যতে পণ্যের দাম বাড়বে না কমবে, এই অনিশ্চয়তা থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটি আর্থিক কৌশল। ধরুন, একজন আমদানিকারককে ছয় মাস পর ভোজ্যতেল কিনতে হবে। কিন্তু তিনি জানেন না তখন দাম কত হবে। হেজিংয়ের মাধ্যমে তিনি এখনই একটি চুক্তি করে ফেলতে পারেন যে নির্দিষ্ট দামে তিনি ওই তেল কিনবেন। ফলে দাম বাড়লেও তার কোনো ক্ষতি হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনা অনুযায়ী, যোগ্য আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন হেজিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন, এর মধ্যে রয়েছে কমোডিটি ফিউচার, সোয়াপ, কমোডিটি সূচকভিত্তিক ফরোয়ার্ড চুক্তি এবং অপশন। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, হেজিং কোনো ধরনের জল্পনামূলক ব্যবসার সুযোগ নয়; এটি কেবল প্রকৃত আমদানি ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিবন্ধিত এবং প্রকৃত আমদানি কার্যক্রমের রেকর্ড রয়েছে, এমন আমদানিকারকরা এই সুবিধা নিতে পারবেন। এর মধ্যে রয়েছেন অপরিশোধিত তেল, ভোজ্যতেল, ধাতু, খাদ্যশস্য, সারসহ বিভিন্ন প্রাথমিক কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিকারকরা। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিকারক এবং কৌশলগত বা বড় পরিসরে পণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানও এই সুবিধার আওতায় পড়বে। আমদানিকারকরা তাদের প্রকৃত আমদানি ঝুঁকির সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হেজিং করতে পারবেন, তবে এর জন্য প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সংরক্ষণ ও নির্ধারিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।
এতদিন পণ্যের মূল্যঝুঁকি হেজিংয়ের জন্য আমদানিকারকদের বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হতো। প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়া ছিল সময়সাপেক্ষ ও জটিল। নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে নির্ধারিত শর্ত ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় এডি ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি এ ধরনের লেনদেনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আমদানিকারকরা এখন ব্যাংকের মাধ্যমেই দ্রুত হেজিং করতে পারবেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বারবার যেতে হবে না। এতে ব্যবসার গতি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখা সহজ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে, হেজিং শুধুমাত্র প্রকৃত আমদানি ঝুঁকি কমানোর জন্য ব্যবহার করতে হবে, কোনোভাবেই এটি স্পেকুলেশন বা লিভারেজড ট্রেডিংয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এডি ব্যাংকগুলোকে যথাযথ যাচাই, নথি সংরক্ষণ, ঝুঁকি প্রকাশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া হেজিং চুক্তির মেয়াদ বা মূল্য প্রকৃত আমদানি দায়ের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। এই শর্তগুলো ঠিকমতো পালন করা গেলে হেজিং ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
ব্যবসায়ী মহল বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দামের বড় ধরনের ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলায় এই ব্যবস্থা কার্যকর সুরক্ষা দেবে। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় পূর্বাভাস দেওয়া সহজ হবে এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করা আরও নির্ভরযোগ্য হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল, ইস্পাত, ভোজ্যতেল ও কৃষিপণ্যের মতো পণ্যের দাম হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব সরাসরি বদলে যায়। এই হেজিং সুবিধা সেই অনিশ্চয়তা কমিয়ে ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে আরও স্থিতিশীল করবে।
সামগ্রিকভাবে, এই নির্দেশনাটি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় এটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, এডি ব্যাংকগুলো কতটা কার্যকরভাবে এই সুবিধা বাস্তবায়ন করে এবং আমদানিকারকরা কতটা এর সুফল পান।

