রাষ্ট্রমালিকানাধীন রূপালী ব্যাংক চলতি বছরের প্রথমার্ধে নজিরবিহীন আর্থিক চাপে পড়েছে। ঋণ থেকে অর্জিত সুদ আয়ের তুলনায় আমানত ও ধার করা অর্থের বিপরীতে দ্বিগুণেরও বেশি সুদ পরিশোধ করতে হওয়ায় ব্যাংকটির আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের প্রভাব মিলিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে ব্যাংকটির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬৪০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অথচ এক বছর আগে একই সময়ে ব্যাংকটি প্রায় ১০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে প্রকাশিত রূপালী ব্যাংকের ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। গত সপ্তাহে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রতিবেদনটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ঋণের বিপরীতে রূপালী ব্যাংকের সুদ আয় হয়েছে ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সুদ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে আমানতকারী এবং বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া ধার করা অর্থের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ২ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। ফলে সুদ ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি সুদ আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংকটির মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকেই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে সুদ আয় ও সুদ ব্যয়ের ব্যবধান নেতিবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুদের ঘাটতি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
ব্যাংকিং খাতে সাধারণভাবে সুদ আয়ই একটি ব্যাংকের প্রধান আয়ের উৎস। সেই আয় যদি সুদ ব্যয়ই মেটাতে না পারে, তাহলে অন্যান্য খাত থেকে আয় বাড়লেও সার্বিক আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা কঠিন হয়ে পড়ে। রূপালী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, অতীতে নিয়ম মেনে ব্যাংকিং পরিচালিত হয়নি। অনেক খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে আয় দেখানো হয়েছিল। বর্তমানে ব্যাংকটি পুরোপুরি নিয়ম অনুসরণ করে হিসাব করছে। এর ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দৃশ্যমান হয়েছে। তিনি জানান, ছোট, মাঝারি ও ভোক্তা ঋণ বিতরণ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও এখন অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ২০৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই খাতে আয় বেড়েছে।
তবে কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও ব্রোকারেজ কার্যক্রম থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে এসব খাত থেকে আয় হয়েছে ১০১ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ২১৫ কোটি টাকা। অন্যান্য উৎস থেকে আয় হয়েছে ৪০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩২ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ থেকে আয় বৃদ্ধি পেলেও কমিশনভিত্তিক আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংকটির মোট আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কারণ বর্তমানে আধুনিক ব্যাংকিংয়ে সুদনির্ভর আয়ের পাশাপাশি কমিশন ও ফি-ভিত্তিক আয়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
এদিকে বেতন-ভাতা, ভবন ভাড়া এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পরিচালন ব্যয় মেটানোর পর ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ৬১০ কোটি টাকা। এরপর নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ এবং সরকারের কর পরিশোধের পর মোট নিট লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
ব্যাংকের আমানত ও ঋণের প্রবৃদ্ধির দিক থেকেও খুব বেশি অগ্রগতি দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ২৮ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে আমানত বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা।
একই সময়ে ব্যাংকটির মোট ঋণ বিতরণ বেড়ে ৫২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণ বিতরণেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তবে তা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
খেলাপি ঋণের হারেও বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণের ৩৯ শতাংশ খেলাপি ছিল। চলতি বছরের জুন শেষে তা সামান্য কমে ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও এই হার এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এত উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ঋণ থেকে প্রত্যাশিত সুদ আদায় সম্ভব হচ্ছে না, যা ব্যাংকের আয় কমিয়ে দিচ্ছে।
শেয়ারবাজারে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে ১৩ টাকা ১৩ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ২০ পয়সা।
শুধু দ্বিতীয় প্রান্তিকের হিসাবেও পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে ২৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ১ পয়সা। অথচ ২০২৫ সালের একই প্রান্তিকে ব্যাংকটি ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল।
চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২২ টাকা ৪৩ পয়সা।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুদ আয়ের ধারাবাহিক পতন এবং আমানতের বিপরীতে বাড়তি সুদ ব্যয়ের সমন্বিত প্রভাব রূপালী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকে কঠিন করে তুলেছে। প্রকৃত আর্থিক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ব্যাংকটি এখন আগের তুলনায় আরও কঠোরভাবে নিয়ম অনুসরণ করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে লোকসান কাটিয়ে উঠতে হলে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার করা, নতুন মানসম্পন্ন ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি, কমিশনভিত্তিক আয় বাড়ানো এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনার বিকল্প নেই।

