মোবাইল আর্থিক সেবার বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৪১২ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। গত বছরের একই সময়ে বিকাশের মুনাফা ছিল ৩০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথমার্ধের মুনাফা বেড়েছে ১০৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৪ শতাংশ।
বিকাশের এই মুনাফা বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে এর মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ব্যাংকের আর্থিক ফলেও। ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকাশের ৫১ শতাংশ মালিকানা রয়েছে ব্যাংকটির হাতে। ফলে বিকাশের মুনাফার ৫১ শতাংশ ব্র্যাক ব্যাংকের হিসাবেও যুক্ত হয়। এ কারণেই চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্র্যাক ব্যাংক রেকর্ড ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
বিকাশের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা হয়েছে প্রায় ২২৮ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিকাশের মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় বেড়েছে ৫৪১ কোটি টাকা।
এই সময়ে বিভিন্ন সেবা পরিচালনায় বিকাশের সরাসরি ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির মোট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে যা ছিল ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। পরিচালন, প্রশাসনিক ও বিপণন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিকাশের পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪৩৭ কোটি টাকা। গত বছর একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৩১৯ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ব্যাংকে রাখা আমানত থেকে বিকাশ আয় করেছে ১৫৯ কোটি টাকা। কর্মীদের তহবিল ও সরকারি কর পরিশোধের পর চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪১২ কোটি টাকা।
৩০ জুন পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, বিকাশের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ই-মানি ইস্যু এবং গ্রাহকদের জমা অর্থ বাড়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট হিসাবে জমার পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। ২০১১ সালের ২১ জুলাই ব্র্যাক ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে বিকাশ। শুরুতে মাত্র ৩৭ জন কর্মী নিয়ে তিনটি সেবা—ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট ও সেন্ড মানি দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির।
এক যুগের বেশি সময়ে সেই ছোট পরিসরের প্রতিষ্ঠানটি এখন বিশাল প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিকাশে কর্মরত রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ। একসময় লোকসানে থাকা বিকাশ এখন দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। গত বছর দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মুনাফার দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল বিকাশ।
দেশীয় দক্ষ জনবলের ওপর নির্ভর করে বেড়ে ওঠা বিকাশে এখন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি), যুক্তরাষ্ট্রের গেটস ফাউন্ডেশন, চীনের আলিবাবা গ্রুপের মালিকানাধীন অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং জাপানের সফটব্যাংক বিকাশের বিনিয়োগকারী। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।
২০১১ সালে বিকাশের যাত্রার সময় মুঠোফোনে টাকা পাঠানোর ধারণা ছিল অনেকের কাছে নতুন। তখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অর্থ পাঠাতে কুরিয়ার বা ডাক বিভাগের ওপর নির্ভর করতে হতো। সময় লাগত কয়েক দিন। সরকারি বিল পরিশোধ কিংবা ব্যাংকিং সেবার জন্য মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হতো। বিকাশের মাধ্যমে সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে বিকাশ অ্যাপে পাওয়া যাচ্ছে ২০০টির বেশি সেবা। ফলে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় আর্থিক সেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
শুধু টাকা পাঠানো বা গ্রহণ নয়, বিকাশ এখন বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সেবার সুযোগ দিচ্ছে। নির্দিষ্ট গ্রাহকেরা অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। চালুর পর থেকে ৩৫ লাখ গ্রাহক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ এই ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। এ ছাড়া বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে সঞ্চয়ের সুবিধাও যুক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহক বিকাশের মাধ্যমে ডিপিএস ও সঞ্চয় হিসাব খুলেছেন।
আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বিকাশের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সুবিধা সহজে পৌঁছে দেওয়া। দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার এজেন্ট কার্যত মানুষের জন্য ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে কাজ করছেন। প্রবাসী আয় ও শহরের অর্থ সহজে গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে বিকাশ গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এখন বিকাশের মাধ্যমে বেতন পাচ্ছেন। এসব কর্মীর বড় অংশই নারী।
এ ছাড়া সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন ভাতাও বিকাশের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি।

