দেশের ব্যাংক খাতে এত দিন আলোচনায় থাকত মূলত বড় অঙ্কের ঋণখেলাপির ঘটনা। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এখন ছোট অঙ্কের ঋণেও খেলাপি হওয়ার প্রবণতা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক ঋণগ্রহীতা এবং ব্যক্তি পর্যায়ের গৃহঋণ গ্রাহকদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যা এক বছরেই দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক কোটি টাকার নিচে ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যা গত মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ ৪৩ হাজারে। অথচ ঠিক এক বছর আগে, অর্থাৎ গত বছরের মার্চ পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২১ লাখ ৬৩ হাজারের মতো। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ছোট গ্রাহকদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৪ লাখ, যা সংখ্যার হিসেবে দ্বিগুণেরও বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, ছোট অঙ্কের ঋণে খেলাপির এই উল্লম্ফন মূলত খুচরা পর্যায়ের ঋণমানের সার্বিক অবনতিরই ইঙ্গিত। এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে—দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবারভিত্তিক ঋণের বোঝা ভারী হয়ে ওঠা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতি কমে যাওয়া এবং কৃষি ও ছোট ব্যবসায় জড়িতদের ঋণ শোধ করার সামর্থ্য কমে যাওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিকর হলেও, ছোট ঋণ হিসাবে এভাবে দ্রুত খেলাপি বেড়ে যাওয়া গোটা আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
এ প্রসঙ্গে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, ছোট ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অবশ্যই উদ্বেগজনক, তবে তা একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক চাপ ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেতনভুক কর্মী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবারই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে এসেছে বলে তিনি মনে করেন। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের ব্যয় বৃদ্ধিও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি—প্রায় ৩৪ শতাংশ—এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। তবে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ছোট ঋণে খেলাপির হার সব ক্ষেত্রে একই রকম নয়, প্রতিষ্ঠানভেদে এই চিত্রে তারতম্য রয়েছে।
কৃষিঋণে দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাহকভিত্তি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকের। এই ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, তাদের খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা গত এক বছরে সামান্য কমে ২৪ লাখ থেকে ২০ লাখে নেমে এসেছে। তবে সংখ্যার হিসেবে কমলেও ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৮ শতাংশই এখনো খেলাপি হয়ে আছে। ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতে কৃষিঋণ মওকুফ করা হলেও সেই অর্থ সরকারের কাছ থেকে দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি। তবে এবার প্রায় ৬০০ কোটি টাকা তারা ইতিমধ্যে হাতে পেয়েছেন এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে শাখা পর্যায়ে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাত থেকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সার্বিক খেলাপির হার প্রায় সাড়ে ৩২ শতাংশ। এই বিপুল অঙ্কের ঋণকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে ছোট ও সবচেয়ে বড় ঋণের শ্রেণিতে খেলাপির চিত্র সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো।
এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট স্থিতি ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে টাকার অঙ্কে খেলাপির হার প্রায় ১৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এই হার তুলনামূলক কম মনে হলেও গ্রাহকসংখ্যার নিরিখে চিত্রটি রীতিমতো উদ্বেগজনক—আগেই বলা হয়েছে, এই শ্রেণিতে খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা এক বছরে ২১ লাখ ৬৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঋণ, অর্থাৎ ৫০ কোটি টাকার ওপরে থাকা ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যেখানে খেলাপির হার সাড়ে ৪২ শতাংশের কাছাকাছি। এই শ্রেণিতে গ্রাহকসংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও এক বছরে খেলাপি গ্রাহক ১ হাজার ৪৭৮ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
একটি ইসলামি ধারার বেসরকারি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত শীর্ষ নির্বাহী জানিয়েছেন, একটি বিশেষ শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ হিসাব বাদ দিলে তাদের ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সামগ্রিক ব্যাংক খাতের তুলনায় কম। তাঁর ভাষ্যে, পুরো খাতে খেলাপির হার প্রায় ৩০ শতাংশ হলেও তাদের ব্যাংকে তা ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এবং বাকি খেলাপি ঋণ আদায় বা নিয়মিতকরণের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
মাঝারি অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রেও খেলাপি বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট। ১ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা, যেখানে খেলাপির হার সাড়ে ২৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই শ্রেণিতে খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা এক বছরে ২৫ হাজার ৪৭৭ থেকে বেড়ে ২৮ হাজার ৫০১ হয়েছে।
১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার আরও বেশি, প্রায় ৪৫ শতাংশ। এই শ্রেণিতে গ্রাহকসংখ্যা ৩ হাজার ৩৩৬ থেকে বেড়ে ৬ হাজার ১৮৬-এ পৌঁছেছে। ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার প্রায় ৩৬ শতাংশ, গ্রাহকসংখ্যা ১ হাজার ১২৫ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫৭৪। ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার প্রায় ৩৯ শতাংশ, গ্রাহকসংখ্যা ৬০৫ থেকে বেড়ে ৯৫২। আর ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪৫ শতাংশ, গ্রাহকসংখ্যা ৩৯২ থেকে বেড়ে ৬৬৯-এ দাঁড়িয়েছে।
একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, বড় ঋণের পাশাপাশি এখন কৃষি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প খাতের ঋণও ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ কারণে শাখা পর্যায়ে তদারকি ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে এসব ঋণ নিয়মিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাতওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য খাত খেলাপি ঋণের শীর্ষে অবস্থান করছে। মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ এই খাতে বিতরণ করা হয়েছে, যার প্রায় ৪৪ শতাংশই এখন খেলাপি। শিল্প খাতে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের প্রায় ৩৪ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এই খাতের মধ্যেও কুটির শিল্পের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক—সেখানে খেলাপির হার প্রায় ৫৩ শতাংশ, আর মাঝারি শিল্পে এই হার প্রায় ৩৮ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে ভোক্তা ঋণ, যা মোট ঋণের প্রায় ৯ শতাংশ এবং যেখানে খেলাপির হার মাত্র ৭ শতাংশ। নির্মাণ খাতে মোট ঋণের প্রায় ৭ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে, খেলাপির হার প্রায় ৩০ শতাংশ। কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে মোট ঋণের সোয়া চার শতাংশের মতো বিতরণ করা হয়েছে, যেখানে খেলাপির হার প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে।
একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, তাদের ব্যাংকে ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প খাতে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে খেলাপির পরিমাণ প্রায় ৯৩ কোটি টাকা, যার সিংহভাগই মহামারিকালীন সময়ে খারাপ হয়েছিল বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, ছোট উদ্যোক্তাদের সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা না দিতে পারলে তাঁরা আর্থিক সংকটে পড়ে যান, আর এটিই মূলত ছোট ঋণে খেলাপি বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ।
সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট—বড় গ্রাহকদের খেলাপির পাশাপাশি এখন সাধারণ ও ছোট গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও দ্রুত কমছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে ছোট ঋণে খেলাপির এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

