বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আবারও বাড়ছে আমানত। একদিকে আমানতের ওপর তুলনামূলক বেশি সুদ, অন্যদিকে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে আসা এবং বিকল্প বিনিয়োগের সীমিত সুযোগ—সব মিলিয়ে মানুষ আবার ব্যাংকেই সঞ্চয় রাখতে আগ্রহী হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে এই পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে আমানত বেড়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা, যা ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মোট আমানতের ৫৬ শতাংশই ব্যক্তিগত গ্রাহকদের। আর শিল্প, ব্যবসা ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ২৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের হাতে রয়েছে মোট আমানতের ৮৩ শতাংশ, আর সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর অংশ ১৭ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক হলেও প্রকৃত সুফল তখনই মিলবে, যখন ব্যাংকগুলো এই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারবে। শুধু আমানত বাড়লেই অর্থনীতির গতি বাড়বে না; বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
গত এক বছরে শুধু আমানতই নয়, ব্যাংক হিসাবের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৫ কোটি ৫২ লাখ থেকে বেড়ে ১৭ কোটি ১১ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে ব্যক্তিগত আমানতের পরিমাণ ১০ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যক্তি গ্রাহকদের আমানত ব্যাংকগুলোর জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। কারণ বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো এসব আমানত হঠাৎ করে তুলে নেওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও বিনিয়োগে এই অর্থ ব্যবহার করা সহজ হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে অনিয়ম ও তারল্য সংকটের কারণে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগ, দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় অনেক গ্রাহক আবার ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে শুরু করেছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তার কারণে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলে রেখেছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সেই অর্থের একটি বড় অংশ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিও ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার ফলে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হয়েছে, যার একটি অংশও আমানত হিসেবে ব্যাংকে জমা হয়েছে। বর্তমানে অনেক ব্যাংক ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে, যা সঞ্চয়কারীদের জন্য ব্যাংককে আগের তুলনায় আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের অধিকাংশ ব্যক্তি আমানতকারীই ছোট ও মাঝারি সঞ্চয়কারী। ২ লাখ টাকার কম আমানত রয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৮৮ লাখ হিসাবে। যদিও সংখ্যার দিক থেকে এরা সবচেয়ে বেশি, তবে মোট আমানতের বড় অংশ এসেছে মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে।
প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ হিসাবধারীর আমানত ২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে। এই শ্রেণির মোট আমানতের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যক্তি আমানতের সবচেয়ে বড় অংশ।
অন্যদিকে ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা আমানত রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার হিসাবে। ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার হিসাবে। আর ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে মাত্র ৪০ হাজারের কিছু বেশি হিসাবে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত ছোট ও মাঝারি সঞ্চয়কারীদের ওপরই নির্ভরশীল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধিতে। দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক সেবা ও বেশি সুদের কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলো বেশি আমানত আকর্ষণ করলেও গত এক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তুলনামূলক দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত এক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ।
ব্যাংকারদের মতে, কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে আমানত উত্তোলনসংক্রান্ত সমস্যার পাশাপাশি কিছু শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করার সরকারি উদ্যোগের কারণে অনেক গ্রাহক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর করেছেন। তবে এখনো মোট আমানতের ৬৯ শতাংশ রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকে এবং ২৪ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে।
শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও আমানত দ্রুত বাড়ছে। গত এক বছরে গ্রামীণ এলাকায় আমানত বেড়েছে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ, যেখানে শহরাঞ্চলে প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যদিও এখনো মোট আমানতের ৮৪ শতাংশ শহরাঞ্চলেই রয়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, গ্রামে প্রতিনিধি ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তার মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য করে দিয়েছে। ফলে গ্রামের মানুষও আগের তুলনায় বেশি হারে ব্যাংকে সঞ্চয় করছেন।
অন্যদিকে বিকল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো এখনো প্রত্যাশিত আস্থা তৈরি করতে পারেনি। সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কিছুটা বাড়লেও শেয়ারবাজার দীর্ঘদিন ধরেই মন্দায় রয়েছে। স্বর্ণের দাম অনেক বেশি হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, আর আবাসন বাজারও খুব বেশি চাঙা নয়। একই সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ তহবিল ও করপোরেট বন্ডেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সীমিত।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা, তারল্য এবং তুলনামূলক নিশ্চিত মুনাফার কারণে ব্যাংকই দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঞ্চয়ের ঠিকানা হয়ে উঠেছে। তবে এই বাড়তি আমানতকে যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে রূপান্তর করা না যায়, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না।

