বিশ্বজুড়ে আর্থিক খাতে দ্রুত পরিবর্তন এনে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একসময় যেখানে একটি ব্যাংকের গ্রাহকদের তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন কিংবা নতুন সেবার প্রস্তাব তৈরি করতে সপ্তাহ কিংবা মাস লেগে যেত, এখন সেই কাজ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হচ্ছে। এর ফলে গ্রাহকসেবা যেমন দ্রুত হচ্ছে, তেমনি জালিয়াতি প্রতিরোধ, ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও এসেছে নতুন গতি।
বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো গ্রাহককে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা দেওয়া।
একসময় প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ হিসাবধারী ও কার্ড ব্যবহারকারীর লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং বিশ্লেষণের পর গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন আর্থিক সেবার প্রস্তাব তৈরি করত সিটি ব্যাংক। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে অনেক সময় লেগে যেত। ফলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রয়োজনের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রস্তাব পৌঁছাত। কেউ বড় অঙ্কের টাকা জমা রাখলেও সেটি হয়তো ইতোমধ্যে অন্য কাজে ব্যয় হয়ে যেত। আবার সঞ্চয়ভিত্তিক কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দেওয়ার অনেক পরে সেই প্রস্তাব গ্রাহকের কাছে পৌঁছাত।
এই চিত্র এখন বদলেছে। ব্যাংকটির নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিনের লেনদেন দিনের শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। রাতের মধ্যেই গ্রাহকের তথ্য হালনাগাদ হয়ে যাচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরদিনই ঋণ, আমানত, বীমা কিংবা ঋণপত্রের মতো বিভিন্ন সেবার উপযুক্ত পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ ইব্রাহিম সাজিদ জানিয়েছেন, এখন কোনো গ্রাহকের দিনের লেনদেনে যদি নতুন আর্থিক প্রয়োজনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে পরদিনই তাকে উপযুক্ত সেবার সুপারিশ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ব্যাংকিং খাতে ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠছে। আগে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত প্রযুক্তি এখন নিয়মিত পরিচালন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিশ্লেষণ, গ্রাহকের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সেবা বেছে দেওয়ার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে বড় আকারের প্রতিবেদন সংক্ষেপ করা, প্রয়োজনীয় নথি তৈরি এবং গ্রাহকদের মতামত বিশ্লেষণের কাজও দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের একটি ঘটেছে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। অনলাইন ব্যাংকিং যত বিস্তৃত হচ্ছে, প্রতারণার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। প্রচলিত নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা দিয়ে সব ধরনের জালিয়াতি শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে লাখ লাখ লেনদেন বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। এর ফলে অর্থ পাচার, প্রতারণা কিংবা সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করা অনেক সহজ হয়েছে।
ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও রশিদ জানিয়েছেন, তাদের ব্যাংকে হিসাব খোলার সময় মুখমণ্ডল যাচাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া আরও নিরাপদ ও দ্রুত হয়েছে। পাশাপাশি নথি যাচাই, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণ, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকও একই পথে এগোচ্ছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতি উল হাসান জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার ব্যবস্থাও আরও উন্নত করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলো আরও নিরাপদ, সহজ এবং সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা।
এনসিসি ব্যাংকও নিজেদের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করেছে। এটিএম পর্যবেক্ষণ, পরিচয় যাচাই, ভুয়া চেহারা শনাক্তকরণ, ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ এবং বাণিজ্যিক অর্থায়নের ঝুঁকি মূল্যায়নের মতো ক্ষেত্রেও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে কোনো ব্যক্তি ঋণ পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নির্ধারণে আর্থিক বিবরণী, জামানত এবং দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন লেনদেনের ইতিহাস, আয়-ব্যয়ের ধারা, ঋণ পরিশোধের অভ্যাসসহ নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে অনেক দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে সঠিক গ্রাহককে দ্রুত ঋণ দেওয়া যেমন সহজ হচ্ছে, তেমনি ভবিষ্যতে খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনাও আগেভাগে শনাক্ত করা যাচ্ছে।
শুধু গ্রাহকসেবাই নয়, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কাজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কর্মী নিয়োগের জন্য আবেদনপত্র বাছাই, বিভিন্ন নথি প্রস্তুত, নিয়ম মেনে কাজ হচ্ছে কি না তা যাচাই এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক জানিয়েছে, তাদের প্রায় ২৫টি ব্যাংকিং কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হচ্ছে। হিসাব খোলা থেকে শুরু করে ঋণ বিতরণ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে এই প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করছে এবং ভুলের সম্ভাবনা কমিয়ে আনছে।
গ্রাহকদের কাছেও সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে সেবার গতিতে। আগে একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এখন অনেক ব্যাংকে দিন-রাত যেকোনো সময় স্বয়ংক্রিয় সহকারী গ্রাহকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। সিটি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কল সেবাকেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার গ্রাহক যোগাযোগ করেন। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার প্রশ্ন এখন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা হচ্ছে। ফলে অপেক্ষার সময় কমছে এবং সেবার মানও উন্নত হচ্ছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করেছে এবং ভবিষ্যতে কণ্ঠভিত্তিক সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ইস্টার্ন ব্যাংক প্রথমে নিজেদের কর্মীদের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করলেও পরে তা গ্রাহকসেবায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে।
শুধু ব্যাংক নয়, দেশের পুঁজিবাজারেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সন্দেহজনক শেয়ার লেনদেন শনাক্ত করার জন্য নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই হবে না, গ্রাহকের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে পুরো ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করতে হবে। তা না হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিকাশ গ্রাহকের ব্যবহার বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সেবার পরামর্শ দিচ্ছে, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানে ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে এবং পরিচয় যাচাইয়ের কাজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। অন্যদিকে নগদ তাদের প্রচারণামূলক বিভিন্ন উপকরণ তৈরিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে বলে জানিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত শক্তিশালীই হোক, এর ব্যবহার হতে হবে দায়িত্বশীল। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা মেনে চলা নিশ্চিত না হলে এই প্রযুক্তির সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়, বরং মানুষের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও কার্যকর করার একটি শক্তিশালী সহায়ক মাধ্যম—এই দৃষ্টিভঙ্গিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আর্থিক খাত এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শুধু সেবার গতি নয়, পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধরনই বদলে যাচ্ছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত, উন্নত নিরাপত্তা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের ব্যাংকিংকে নতুন রূপ দিচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তির পাশাপাশি নৈতিক ব্যবহার, তথ্য সুরক্ষা এবং মানুষের প্রতি আস্থাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর।

