সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে অর্থ উত্তোলনের আবেদন করেও অনেক গ্রাহক টাকা তুলতে যাচ্ছেন না। একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে জমা পড়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত এই ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি গ্রাহকের আস্থা ফেরার ইতিবাচক লক্ষণ।
ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা তোলার আবেদন করেছেন। কিন্তু এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহক এ পর্যন্ত টাকা তুলেছেন। তাঁদের উত্তোলনের পরিমাণ ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ আবেদনকারীদের প্রায় অর্ধেক এখনো টাকা নেননি। আবেদন করা অর্থের একটি বড় অংশও ব্যাংকেই রয়ে গেছে।
একই সময়ে ব্যাংকে নতুন হিসাব খোলার প্রবণতাও দেখা গেছে। ২০ দিনে খোলা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৪টি নতুন হিসাব। এসব হিসাবের মাধ্যমে জমা পড়েছে প্রায় ৩৭৮ কোটি টাকা।
ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা, অনেক গ্রাহক আবেদন করলেও প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে টাকা তুলছেন। তাই আবেদন করা পুরো অর্থ একসঙ্গে ব্যাংক থেকে বের হচ্ছে না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি ব্যাংকে অর্থের প্রবাহও অব্যাহত আছে। ব্যক্তিগত হিসাবে স্বাভাবিক লেনদেন চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে বলে জানান তিনি।
ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল আমানত ফেরত দিতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই অর্থ দিয়েই টাকা ফেরতের কার্যক্রম চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা এবং মেয়াদি আমানতের মূল অংশ তুলতে পারবেন।
তবে একটি শর্ত আছে। মেয়াদি আমানতের পুরো মূল টাকা একসঙ্গে তুলে নিলে সেটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে ধরা হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো মুনাফা মিলবে না। যাঁরা এখন টাকা না তুলে আমানত চালু রাখবেন, তাঁরা চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হারে মুনাফা পাবেন। ব্যাংকের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে পরে মুনাফাসহ অর্থ জমা ও উত্তোলনের পূর্ণ সুযোগ থাকবে।
চরম অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির কারণে সংকটে পড়েছিল এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা ছিল। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবেই আছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
আবেদন ও প্রকৃত উত্তোলনের ফারাক বলছে, অনেক গ্রাহক সম্ভবত আগেভাগে সুযোগ নিশ্চিত রাখতে চেয়েছিলেন। আবার মেয়াদি আমানতে পুরো টাকা তুললে মুনাফা না পাওয়ার শর্তও অনেককে টাকা রেখে দিতে উৎসাহ দিয়ে থাকতে পারে। তবে এটি অনুমান। গ্রাহকদের সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো ব্যাখ্যা করেনি।
নতুন আমানত ও নতুন হিসাব খোলার তথ্য ইতিবাচক হলেও তা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতির নিশ্চয়তা নয়। ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানতের বিপরীতে নতুন জমা ও পরিশোধের অঙ্ক এখনো তুলনামূলক ছোট। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তার ওপর ব্যাংকের নির্ভরতাও এখনো স্পষ্ট। ফলে আস্থা কতটা টেকসই হয়, তা দেখা যাবে আগামী মাসগুলোর উত্তোলন ও জমার ধারায়। পাশাপাশি ঋণ আদায়, পরিচালনা কাঠামো ও অনিয়মের দায় নিরূপণের অগ্রগতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখবে।

