দেশে নগদ অর্থ প্রবাহের ধারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। জুন মাসে মানুষের হাতে বা ঘরে রাখা নগদ টাকার পরিমাণ এক মাসের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা, আর একই সময়ে ব্যাংকে জমা আমানত বেড়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে এই তথ্য উঠে এসেছে, যা ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের একটি অংশের আবার ব্যাংকমুখী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা, যেখানে মে মাসে এই অঙ্ক ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা, শতাংশের হিসাবে যা প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ।
তবে গত বছরের একই মাসের তুলনায় চিত্রটা ভিন্ন। গত বছরের জুনে ব্যাংকের বাইরে নগদের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা, অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে তা এখনো প্রায় সাড়ে তেরো শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, এর আগের মাস মে-তে ব্যাংকের বাইরে নগদ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মে মাসে নগদ অর্থ বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ ছিল কোরবানির ঈদ এবং একটি ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা। জুনে সেই প্রবণতা কিছুটা উল্টে গেলেও তা প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ধারণা, সামনের দিনগুলোতে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদের পরিমাণ আরও কমবে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, আমানতের সুদহার বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানোর বিভিন্ন উদ্যোগ এই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখছে। সুদহার বাড়ায় মেয়াদি আমানত ও বিভিন্ন সঞ্চয়ী প্রকল্পে এখন তুলনামূলক ভালো রিটার্ন মিলছে, যা মানুষকে ঘরে টাকা না রেখে ব্যাংকমুখী হতে উৎসাহ দিচ্ছে। পাশাপাশি ঘরে বড় অঙ্কের নগদ রাখলে চুরি বা হারিয়ে যাওয়ার মতো নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও থেকে যায়।
জুন মাসে ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ ৭৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা, যা মে মাসে ছিল ২০ লাখ ৪১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে প্রায় ৩৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা, শতাংশের হিসাবে প্রায় পৌনে দুই শতাংশ। বছরের ব্যবধানে এই বৃদ্ধির পরিমাণ আরও চোখে পড়ার মতো—প্রায় ২ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে দশ শতাংশ।
ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকারও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। সংসদে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে এবং আগে আলোচিত ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি বাতিল করা হচ্ছে। নতুন আমানত সুরক্ষা আইনেও ব্যাংক অবসায়নের ক্ষেত্রে যোগ্য আমানতকারীদের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অর্থ দ্রুত ফেরত পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এসব উদ্যোগ ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের ধারণায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু আমানত বৃদ্ধি দিয়েই বিচার করা ঠিক হবে না যে ব্যাংক খাতের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের চাপ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট, সুশাসনের ঘাটতি এবং সম্পদের মান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে বলে তাঁর মত। নতুন আমানত কতটা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী থাকবে এবং ব্যাংকগুলো তা কতটা নিরাপদ ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় বলে মনে করেন তিনি।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়ার পর থেকে ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানত সংগ্রহে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, এবং আকর্ষণীয় সুদের কারণে ঘরে থাকা কিছু অর্থ আমানতে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে মোট আমানত বৃদ্ধির পুরোটাই যে নগদ টাকা ব্যাংকে ফেরার ফল, এমনটা বলার সুযোগ নেই। নতুন সঞ্চয়, জমার ওপর যুক্ত হওয়া সুদ এবং স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লেনদেনও এই প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংকের বাইরে নগদ কমার এই প্রবণতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, তা কতটা টেকসই হবে তা নির্ভর করছে ব্যাংক খাতে আস্থা ধরে রাখা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর।

